সম্পাদকীয়

জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় নবায়নযোগ্য শক্তি, নদীর নাব্য সংরক্ষণ ও পরিবেশবান্ধব নগর পরিকল্পনা: আতাউর রহমান মিন্টু

বৈশ্বিক গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনে বাংলাদেশের মোট অবদান মাত্র ০.৫৬ শতাংশ হলেও ভৌগোলিক গঠন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং নদীমাতৃক ভূমির কারণে দেশটিকে বৈশ্বিক জলবায়ু ঝুঁকি সূচকে সপ্তম শীর্ষ ক্ষতিগ্রস্ত রাষ্ট্র হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

২০০০ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে বাংলাদেশে ঘটে যাওয়া ১৮৫টি চরম আবহাওয়াজনিত দুর্যোগের ফলে আনুমানিক ১১,৪৫০ জন মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে এবং প্রত্যক্ষ অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩.৭২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।

জলবায়ু পরিবর্তনের এই তীব্র ধারা অব্যাহত থাকলে ২০৫০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের কৃষি খাতের মোট দেশজ উৎপাদনের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বিলুপ্ত হওয়ার আশঙ্কাজনক সম্ভাবনা রয়েছে।

এই বহুমাত্রিক ঝুঁকি মোকাবিলায় বাংলাদেশ প্রতি বছর অভিযোজন এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় প্রায় ৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বাজেট বরাদ্দ রাখছে, যার ৭৫ শতাংশ তহবিল নিজস্ব অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে সংস্থান করা হয়।

তবে কেবল জলবায়ু অভিযোজনই পর্যাপ্ত নয়; দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও পরিবেশগত সুশাসন অর্জনের জন্য জ্বালানি খাতকে কার্বনমুক্ত করা, অভ্যন্তরীণ নদী ব্যবস্থার নাব্য ও পরিচ্ছন্নতা ফিরিয়ে আনা এবং অনিয়ন্ত্রিতভাবে বর্ধনশীল ঢাকা মহানগরীকে পরিবেশবান্ধব নগরী হিসেবে গড়ে তোলা অত্যন্ত অপরিহার্য।

নবায়নযোগ্য শক্তি ও টেকসই জ্বালানি রূপান্তর কৌশল

বাংলাদেশের জাতীয় বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থা ঐতিহাসিকভাবে জীবাশ্ম জ্বালানি, বিশেষত দেশীয় প্রাকৃতিক গ্যাসের ওপর চরমভাবে নির্ভরশীল। বর্তমানে জাতীয় বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রায় ৯৮ শতাংশ জীবাশ্ম জ্বালানিভিত্তিক, যার মধ্যে এককভাবে প্রাকৃতিক গ্যাসের অবদান ৬৭ থেকে ৬৮ শতাংশ এবং কয়লার অবদান প্রায় ২০ শতাংশে উন্নীত হয়েছে।

আমদানিকৃত তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস ও কয়লার আন্তর্জাতিক বাজারে অনিয়ন্ত্রিত মূল্যের ওঠানামা দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি এবং বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের আর্থিক স্থিতিশীলতাকে দীর্ঘমেয়াদী রাজস্ব ঘাটতির মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। বিপরীতে, জাতীয় বিদ্যুতের মূল গ্রিডে অন-গ্রিড ও অফ-গ্রিড মিলিয়ে নবায়নযোগ্য শক্তির বর্তমান অবদান মাত্র ১.৬ থেকে ৩ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ, যার মোট ইনস্টলড সক্ষমতা ১,৩৮১ থেকে ১,৫৫৯ মেগাওয়াট।

বাংলাদেশ জাতীয়ভাবে নির্ধারিত অবদান কাঠামোর আওতায় ২০৩০ সালের মধ্যে প্রাক্কলিত ব্যবসায়িক স্বাভাবিক অবস্থার তুলনায় গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন ২১.৮ শতাংশ হ্রাসের বৈশ্বিক লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। এই আন্তর্জাতিক প্রতিশ্রুতি অর্জনে ‘মুজিব ক্লাইমেট প্রসপারিটি প্ল্যান’-এ ২০৪১ সালের মধ্যে মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের ৪০ শতাংশ নবায়নযোগ্য শক্তি থেকে অর্জনের উচ্চাভিলাষী সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য রাখা হয়েছে।

তবে ২০২৩ সালে সরকার গৃহীত ‘ইন্টিগ্রেটেড এনার্জি অ্যান্ড পাওয়ার মাস্টার প্ল্যান’ -এর সাথে MCPP-এর লক্ষ্যমাত্রার নীতিগত অসঙ্গতি দেখা যায়। IEPMP-তে ২০৪১ সালের মধ্যে ৪০ শতাংশ “পরিচ্ছন্ন শক্তি” (Clean Energy) অর্জনের প্রস্তাব করা হলেও সেখানে পরিচ্ছন্ন শক্তির সংজ্ঞায় পারমাণবিক শক্তি, হাইড্রোজেন কো-ফায়ারিং এবং আমদানিকৃত গ্যাসের সাথে কার্বন ক্যাপচার অ্যান্ড স্টোরেজ যুক্ত অনির্ধারিত প্রযুক্তিকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

প্রকৃতপক্ষে, IEPMP পরিকল্পনায় সৌর ও বায়ুবিদ্যুতের মতো প্রথাগত নবায়নযোগ্য উৎসের অবদান ২০৪১ সাল নাগাদ মাত্র ৯ শতাংশ (প্রায় ৫,২৮০ মেগাওয়াট) ধরা হয়েছে, যা আন্তর্জাতিক ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা সীমিত রাখার নীতির পরিপন্থী এবং কয়লা ও গ্যাসের ওপর দীর্ঘমেয়াদী আমদানিনির্ভরতা বজায় রাখে।

ভৌগোলিক অবস্থানগত কারণে বাংলাদেশে সৌর বিকিরণের তীব্রতা অত্যন্ত অনুকূল। দেশে প্রতিদিন গড় সৌর বিকিরণ ৪ থেকে ৬.৫ কিলোওয়াট-ঘণ্টা/বর্গমিটার, যা বছরে প্রায় ১,৯০০ কিলোওয়াট-ঘণ্টা/বর্গমিটার কার্যকর শক্তি উৎপাদনে সক্ষম।

ইউএস ন্যাশনাল রেনুয়েবল এনার্জি ল্যাবরেটরি-এর প্রযুক্তিগত সমীক্ষা অনুযায়ী, বাংলাদেশে ইউটিলিটি-স্কেল সৌর বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে ১৫৬ গিগাওয়াট এবং উপকূলীয় বায়ুসম্পদ থেকে ১৫০ গিগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের কারিগরি সম্ভাব্য পরিবেশ বিদ্যমান।

কৃষিজমির স্বল্পতার প্রেক্ষাপটে প্রচলিত ভূমির পরিবর্তে বিকল্প জমি ব্যবহারের বিশাল সুযোগ রয়েছে। দেশে বিদ্যমান ১,৫০০ বর্গকিলোমিটার বদ্ধ জলাশয় ও পুকুরের এক-তৃতীয়াংশ ব্যবহার করে ১৫ গিগাওয়াট, ২,৫০০ বর্গকিলোমিটার অগভীর জলাভূমির ১০ শতাংশ ব্যবহার করে ২৫ গিগাওয়াট এবং কাপ্তাই হ্রদ ও নদীবহুল পকেট এলাকা থেকে ২০ গিগাওয়াট ভাসমান সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব।

এছাড়া শিল্প ও আবাসিক ভবনের প্রায় ৫,০০০ বর্গকিলোমিটার ছাদের ১০ শতাংশ এলাকা ব্যবহার করে ২৫ গিগাওয়াট ছাদভিত্তিক সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদনে জাতীয় সৌর রোডম্যাপে সুপারিশ করা হয়েছে। একই সাথে সন্দ্বীপ, কুয়াকাটা, কক্সবাজার ও সেন্ট মার্টিনের মতো উপকূলীয় এলাকায় ১৪০ থেকে ১৬০ মিটার হাব-উচ্চতায় বায়ুবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন করে উপকূলীয় ও বিচ্ছিন্ন দ্বীপ অঞ্চলগুলোকে সরাসরি নবায়নযোগ্য শক্তিতে সংযুক্ত করার পরিবেশ বিদ্যমান।

নবায়নযোগ্য শক্তিতে রূপান্তরের পথে অন্যতম বড় অন্তরায় হলো দীর্ঘমেয়াদী বাণিজ্যিক অর্থায়ন এবং বিনিময় হারের ঝুঁকি। MCPP-এর লক্ষ্যপূরণে ২০৪১ সালের মধ্যে মোট ২৩.৯ বিলিয়ন থেকে ৫৩.৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার নিবেদিত বিনিয়োগ আবশ্যিক, যার প্রায় ৬৫.৬ শতাংশ সৌর অবকাঠামো এবং ১৫.৮ শতাংশ বায়ু অবকাঠামো খাতে নিয়োজিত করা প্রয়োজন।

১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস লক্ষ্যমাত্রার সামঞ্জস্যপূর্ণ পথে এগোতে ২০২৬ থেকে ২০৩০ মেয়াদের মধ্যে প্রতি বছর ১ থেকে ২.৩ বিলিয়ন ডলার এবং ২০৩১ থেকে ২০৪০ মেয়াদের মধ্যে বার্ষিক ৫.৬ থেকে ৯.৭ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রয়োজন হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংক চালু করা সবুজ পুনঃঅর্থায়ন স্কিম এবং ‘সবুজ সুকুক’ ডেবট ইন্সট্রুমেন্টের মাধ্যমে বেসরকারি খাতে অর্থায়ন উৎসাহিত করছে, যার চমৎকার দৃষ্টান্ত বেক্সিমকোর ২৩০ মেগাওয়াট সোলার প্রকল্পের জন্য ৩০ বিলিয়ন টাকার সুকুক ইস্যু।

তবে বৃহৎ অবকাঠামো বাস্তবায়নে আন্তর্জাতিক জলবায়ু তহবিল, উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা এবং দেশীয় ব্যাংকগুলোর সমন্বয়ে ব্লেন্ডেড ফাইনান্স সুবিধা বৃদ্ধি করা এবং সার্বভৌম গ্রিন বন্ড প্রচলন করা এখন সময়ের দাবি।

নদীর নাব্য সংরক্ষণ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও হাইড্রোলজিক্যাল স্থায়িত্ব

বাংলাদেশের নদী ব্যবস্থা একই সাথে দেশের স্বাভাবিক পানি নিষ্কাশন প্রণালী, জীববৈচিত্র্যের আধার এবং সেচ ও নৌপরিবহনের ভিত্তি। তবে অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং শিল্পজাত বর্জ্যের অনিয়ন্ত্রিত নিঃসরণের ফলে রাজধানী ঢাকার চারপাশের নদীগুলো—বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু, শীতলক্ষ্যা এবং টঙ্গী খাল—মারাত্মক হাইড্রোলজিক্যাল ও পরিবেশগত সংকটের মুখোমুখি হয়েছে।

ঢাকা মহানগরী ও নিকটবর্তী শিল্পাঞ্চল থেকে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৮০,০০০ ঘনমিটার অপরিশোধিত বিষাক্ত তরল রাসায়নিক বর্জ্য নদীর পানিতে পতিত হয়। বিস্তৃত মহানগরীর পয়োবর্জ্য ও অন্যান্য গৃহস্থালি নিঃসরণ অন্তর্ভুক্ত করলে প্রতিদিন প্রায় ১৫ লক্ষ (১.৫ মিলিয়ন) ঘনমিটার অপরিশোধিত বর্জ্য সরাসরি নদী ব্যবস্থায় গিয়ে মিশছে।

বিশেষ করে শুষ্ক মৌসুমে নদীর স্বাভাবিক পানি প্রবাহ কমে যাওয়ার ফলে এবং অনিয়ন্ত্রিত কেমিক্যাল ও জৈব বর্জ্যের কারণে তুরাগ ও বুড়িগঙ্গা নদীতে দ্রবীভূত অক্সিজেনের (Dissolved Oxygen – DO) পরিমাণ হ্রাস পেয়ে শূন্যের কাছাকাছি (0 mg/L) পৌঁছে যায়, যা জলজ জীবনের টিকে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় ন্যূনতম ৫.০ mg/L পরিমাণের তুলনায় অত্যন্ত মারাত্মক।

গবেষণায় দেখা গেছে, নদীগুলোর তলদেশের পলিতে সিসা, ক্যাডমিয়াম ও ক্রোমিয়ামের মতো অত্যন্ত ক্ষতিকর ভারী ধাতু এবং উচ্চমাত্রার অ্যামোনিয়ার জমাটবদ্ধতা মার্কিন পরিবেশ সুরক্ষা সংস্থা নির্ধারিত সীমার থেকে অনেক বেশি, যা এই নদীগুলোকে কার্যকরীভাবে জৈবিকভাবে মৃত অবস্থায় উপনীত করেছে।

ঢাকার চারপাশের নদীর গতিপথ ফিরিয়ে আনতে সরকার ২০ বছর মেয়াদী একটি বিস্তৃত মাস্টারপ্ল্যান গ্রহণ করেছে, যা চারটি সুনির্দিষ্ট ধাপে বাস্তবায়িত হচ্ছে: ১ বছরের ক্র্যাশ প্রোগ্রাম, ৩ বছরের স্বল্পমেয়াদী, ৫ বছরের মধ্যমেয়াদী এবং ১০ বছরের দীর্ঘমেয়াদী মাস্টারপ্ল্যান।

এই প্রকল্পের আওতায় বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ ইতোমধ্যেই নদী তীরের অন্তত ১১৩ একর অবৈধ দখলকৃত ভূমি উদ্ধার করেছে এবং প্রায় ১০,০০০ স্থায়ী সীমানা পিলার, ওয়াকওয়ে ও ইকোপার্ক নির্মাণের মাধ্যমে জমি পুনঃদখল রোধের উদ্যোগ নিয়েছে।

নদীর নাব্য ও পানি সুরক্ষায় শিল্প কারখানাগুলোতে অনলাইন সেন্সরভিত্তিক ইফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট তদারকি নিশ্চিত করার পাশাপাশি নিয়মিত ক্যাপিটাল ও মেইনটেন্যান্স ড্রেজিং পরিচালনা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এর পাশাপাশি কৃত্রিম কংক্ৰিটের পরিবর্তে নদী ও খালের পাড় ভাঙন রোধে পরিবেশবান্ধব প্রকৃতিভিত্তিক সমাধান হিসেবে ‘ভেটিভার ঘাস’  প্রযুক্তির ব্যাপক প্রয়োগ আবশ্যক।

ভেটিভার ঘাসের অত্যন্ত দীর্ঘ ও মজবুত শিকড় ব্যবস্থা নদীর পাড় এবং চরাঞ্চলের বাঁধের মাটিকে শক্তভাবে আটকে রাখে, যা অত্যন্ত কম খরচে নদী ভাঙন ও মাটির ক্ষয় রোধে প্রাকৃতিক প্রতিরোধ হিসেবে কাজ করে।

পরিবেশবান্ধব নগর পরিকল্পনা ও ঢাকার বাসযোগ্যতা বৃদ্ধি

বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ জনঘনত্বপূর্ণ মেগাসিটি ঢাকা দীর্ঘদিন ধরে অনিয়ন্ত্রিত বায়ুদূষণ, দীর্ঘস্থায়ী যানজট, নদী ও খাল ভরাটের কারণে জলাবদ্ধতা এবং উন্মুক্ত সবুজ জায়গার আশঙ্কাজনক সংকটে জর্জরিত। আন্তর্জাতিক বাসযোগ্যতা সূচকে (Livability Index) শহরের ক্রমাগত নিম্নমুখী অবস্থান পরিবেশবান্ধব নগর পরিকল্পনার পুনর্গঠনকে বাধ্যতামূলক করে তুলেছে।

ঢাকার পরিবেশগত অবনতির অন্যতম প্রধান চালক হলো এর বায়ুমণ্ডলের দূষণ। বছরের শুষ্ক মৌসুমে ঢাকার বাতাসে অতিসূক্ষ্ম ধূলিকণা বা PM2.5-এর পরিমাণ ওয়ার্ল্ড হেলথ অর্গানাইজেশনের (WHO) নিরাপদ সীমার থেকে বহুগুণ বৃদ্ধি পায়, যা আন্তর্জাতিক বায়ুমান সূচকে (AQI) ঢাকাকে নিয়মিতই বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত বাতাসের নগরী হিসেবে চিহ্নিত করে। অদূরবর্তী অঞ্চলের ইটভাটার বিষাক্ত নির্গমন, ফিটনেসবিহীন যানবাহনের কালো ধোঁয়া, উন্মুক্ত অবকাঠামো নির্মাণের অনিয়ন্ত্রিত ধূলিকণা এবং কঠিন বর্জ্য খোলা স্থানে পোড়ানো এই বায়ু সংকট তৈরি করে।

একই সাথে, শহরের অভ্যন্তরের প্রাকৃতিক ড্রেনেজ ও প্লাবনভূমি ভরাট করে অপরিকল্পিত আবাসন গড়ে তোলার কারণে সামান্য বৃষ্টিপাত হলেও নিষ্কাশন পথ রুদ্ধ হয়ে দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা তৈরি হয়, যা নগরবাসীর স্বাভাবিক জীবনযাত্রা স্তব্ধ করে দেয়।

ঢাকাকে বাসযোগ্য নগরীতে রূপান্তরের কৌশলগত রূপরেখা

ঢাকাকে একটি পরিবেশ-সহনশীল, কর্মক্ষম এবং মানসম্মত মেগাসিটি হিসেবে পুনর্বাসিত করতে হলে চার স্তরের সমন্বিত নগর উন্নয়ন মডেল বাস্তবায়ন করা আবশ্যক।

প্রথমত, রাজউক প্রণীত বিস্তারিত এলাকা পরিকল্পনা (DAP 2016-2035) কঠোরভাবে কার্যকর করে নগরীর জলাশয়, খাল ও প্লাবনভূমি সংরক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে। মাত্রাতিরিক্ত জনঘনত্ব নিরসনে ট্রানজিট-ওরিয়েন্টেড ডেভেলপমেন্ট মডেল অনুসরণ করে স্টেশনভিত্তিক উচ্চ-ঘনত্বের আবাসন গড়ে তুলতে হবে এবং কেন্দ্রীয় ঢাকার ওপর থেকে চাপ কমাতে প্রশাসনিক ও সামাজিক সুবিধাদি পার্শ্ববর্তী স্যাটেলাইট শহরে বিকেন্দ্রীকরণ করতে হবে।

দ্বিতীয়ত, ওয়াসার নির্ধারিত ১২টি বৃহৎ পয়োবর্জ্য শোধনাগার প্রকল্পের দ্রুত বাস্তবায়ন ঘটাতে হবে যাতে গৃহস্থালি বর্জ্য নদীগুলোতে অপরিশোধিত অবস্থায় না পড়ে। শহরের বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় সার্কুলার অর্থনীতি চালু করে উৎসস্থলেই পচনশীল ও অপচনশীল বর্জ্য পৃথকীকরণ করা এবং পচনশীল বর্জ্য থেকে বর্জ্য-থেকে-বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রক্রিয়া জোরদার করা প্রয়োজন।

তৃতীয়ত, ব্যক্তিগত গাড়িনির্ভরতা হ্রাস করে বাস র্যাপিড ট্রানজিট এবং মেট্রোরেল নেটওয়ার্ক শহরের প্রতিটি প্রধান রুটে বিস্তৃত করতে হবে। এর পাশাপাশি ঢাকার চারপাশের সার্কুলার জলপথগুলোকে আধুনিক বোট সার্ভিসের মাধ্যমে পুনরায় সক্রিয় করা হলে তা সড়কপথের চাপ কমাবে।

নৌপরিবহন সড়ক যোগাযোগের তুলনায় ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ কম ব্যয়বহুল এবং কার্বন নির্গমন হ্রাসে অত্যন্ত কার্যকর।

চতুর্থত, শহরের ইট-কংক্রিটের কারণে সৃষ্ট ‘আর্বান হিট আইল্যান্ড’ প্রভাব প্রশমনে নগর বনায়ন এবং প্রতিটি বাসাবাড়িতে ছাদবাগান বাধ্যতামূলক করতে হবে। বায়ুমণ্ডলীয় PM2.5 কণা শোষণ করতে এবং শহরের তাপমাত্রা ২-৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস কমাতে শহরের প্রধান প্রধান প্রধান সড়ক এবং খালের পাড় ঘেঁষে স্থানীয় প্রজাতির গাছের সুনির্দিষ্ট ‘সবুজ বলয়’ গড়ে তুলতে হবে।

বাংলাদেশের স্থায়িত্ব নিশ্চিতকরণ, জলবায়ু সংকট মোকাবিলা এবং অনিয়ন্ত্রিত নগরায়ণ দূর করার প্রক্রিয়াকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখার কোনো সুযোগ নেই। শক্তি খাতের সংস্কার, নদী হাইড্রোলজি সুরক্ষা এবং নগর উন্নয়নকে একটি অভিন্ন জাতীয় জলবায়ু নীতি কাঠামোর অধীনে সুসংগঠিত করা প্রয়োজন।

নীতি নির্ধারকদের জন্য প্রাথমিক ও সুনির্দিষ্ট কৌশলগত সুপারিশসমূহ:

জ্বালানি কাঠামোর পুনর্মূল্যায়ন: IEPMP 2023 পুনরীক্ষণ করে আমদানিকৃত জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানো এবং MCPP-এর ৪০ শতাংশ প্রকৃত নবায়নযোগ্য শক্তির লক্ষ্য পূরণ নিশ্চিত করতে ছাদভিত্তিক ও ভাসমান সৌর প্রকল্পে সরকারি উদ্দীপনা এবং ডেবট ফাইনান্সিং বৃদ্ধি করা।

অববাহিকাভিত্তিক একক নদী কর্তৃপক্ষ গঠন: ঢাকার চারপাশের বুড়িগঙ্গা, তুরাগ ও বালু নদীসহ দেশের মূল নদী প্রণালীর জন্য একটি ক্ষমতাবান একক অথরিটি প্রতিষ্ঠা করে ক্যাপিটাল ড্রেজিং, ইটিপি মনিটরিং এবং পাড় সংরক্ষণে প্রযুক্তিভিত্তিক ‘ভেটিভার সমাধান’ সার্বজনীন করা।

ঢাকার পরিকল্পিত ও বিকেন্দ্রীভূত সংস্কার: রাজউকের DAP (২০১৬-২০৩৫) এর ভূমি ব্যবহার নীতি কঠোরভাবে অনুসরণ করা, ওয়াসার ১২টি পয়োবর্জ্য শোধনাগার সময়মতো চালু করা এবং পরিবহন খাতের কার্বন নিঃসরণ কমাতে MRT, BRT এবং বৃত্তাকার জলপথ পরিবহন সুসংহত করা।

আইনি কঠোরতা ও যৌথ তদারকি: পরিবেশ অধিদপ্তর (DoE), রাজউক, বিআইডব্লিউটিএ এবং সিটি কর্পোরেশনের কার্যকর ডিজিটাল সমন্বয় ঘটিয়ে শিল্পকারখানার বর্জ্য ফেলার বিরুদ্ধে জিরো-টলারেন্স নীতি কার্যকর করা এবং বর্জ্য পৃথকীকরণ আইনগতভাবে বাধ্য করা।

এই বাস্তবসম্মত পদক্ষেপগুলোর দ্রুত ও তদারকিভিত্তিক বাস্তবায়ন জলবায়ু সংকটের চরম ঝুঁকির মুখে থাকা বাংলাদেশকে একটি ডাইনামিক, জলবায়ু-সহনশীল এবং দীর্ঘমেয়াদী পরিবেশবান্ধব অর্থনীতি বিশিষ্ট রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বমঞ্চে টিকে থাকতে সাহায্য করবে।

লেখক: আতাউর রহমান মিন্টু, বিশিষ্ট সাংবাদিক, লেখক ও গবেষক।

Related News

ইইউ-বাংলাদেশ নতুন অংশীদারিত্ব, অনুদান থেকে বাণিজ্য ও টেকসই অর্থনৈতিক সম্ভাবনার বার্তা : রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান

ইইউ রাষ্ট্রদূত মাইকেল মিলারের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে দেওয়া বক্তব্য, ইইউ-বাংলাদেশ বাণিজ্যিক নতুন সম্পর্ক, বিনিয়োগ ও রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে বিশেষ সম্পাদকীয়।

বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর আধুনিকায়নে চীনের জে-১০সিই যুদ্ধবিমান ক্রয়ের উদ্যোগ প্রশংসনীয় : রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান

বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর আধুনিকায়নে চীনের তৈরি জে-১০সিই ফাইটার জেট, অ্যাটাক হেলিকপ্টার ও ড্রোন ক্রয়ের প্রক্রিয়ার ওপর বিশেষ সম্পাদকীয়।

শিক্ষা খাতের সংস্কার, নারী শিক্ষার অগ্রগতি ও আগামীর মানবসম্পদ : আতাউর রহমান মিন্টু

বাংলাদেশের বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থা, নারী শিক্ষার অভাবনীয় অগ্রগতি এবং টেকসই মানবসম্পদ উন্নয়নে প্রয়োজনীয় রোডম্যাপ নিয়ে আতাউর রহমান মিন্টু-এর বিশেষ বিশ্লেষণাত্মক নিবন্ধ।

মহানবী (সা.)-এর সাম্য ও মানবিকতার শিক্ষাই একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠনের মূল চাবিকাঠি : রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান

পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বাণী, মহানবী (সা.)-এর শান্তি, সাম্য ও মানবিক মূল্যবোধের ওপর বিশেষ সম্পাদকীয়।

রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে ৬-দফা কৌশল ও জাতীয় নিরাপত্তার নতুন চ্যালেঞ্জ : রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান

কক্সবাজার ও ভাসানচরের ১১.৮০ লাখ রোহিঙ্গা সংকট, আরাকান আর্মির উত্থান এবং সরকারের ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ ও ৬-দফা কৌশলের ওপর বিশেষ সম্পাদকীয়।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দূরদর্শী দৃষ্টিভঙ্গি ও সার্কের নতুন সম্ভাবনা : রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান

সার্ক মহাসচিবের বিদায়ী সাক্ষাতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের শক্তিশালী সার্ক গড়ার প্রতিশ্রুতি, জিয়াউর রহমানের অবদান স্মরণ ও আঞ্চলিক সহযোগিতা নিয়ে বিশেষ সম্পাদকীয়।

যুক্তরাষ্ট্রের ৪০ ট্রিলিয়ন ডলার ঋণ! বিশ্ব অর্থনীতিতে বাড়ছে উদ্বেগ : রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান

যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় ঋণ ৪০ লাখ কোটি ডলার ছাড়িয়েছে। সুদের হার বৃদ্ধি, বৈশ্বিক অর্থনীতির ওপর প্রভাব ও মার্কিন ঋণ সংকট নিয়ে বিশেষ সম্পাদকীয়।

রাজপথের প্রতিবাদ থেকে দলীয় নীতি-নির্ধারণী কেন্দ্রবিন্দুতে রুহুল কবির রিজভী : রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) রাজনৈতিক বিকাশ ও সাংগঠনিক বিবর্তনের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, তৃণমূলের আন্দোলন এবং রাজপথের কঠিন পরীক্ষা অতিক্রম করে দলীয় মূল নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ে উন্নীত নেতাদের মধ্যে অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী অন্যতম প্রধান ব্যক্তিত্ব।

Search