সম্পাদকীয়

গুমের অন্ধকার থেকে ন্যায়বিচারের পথে বাংলাদেশ : রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান

গুম কেবল কোনো ব্যক্তিবিশেষের ওপর চালানো অপরাধ নয়; এটি পুরো রাষ্ট্রযন্ত্র, সমাজ ও মানবীয় অনুভূতির ওপর এক গভীর কুঠারাঘাত। একজন মানুষ নিহত হলে পরিবার অন্ততঃ শোক পালন করে বাস্তবতাকে মেনে নেওয়ার সুযোগ পায়। কিন্তু গুম হওয়া মানুষের স্বজনেরা বছরের পর বছর শোকও করতে পারেন না, আবার আশাও ছাড়তে পারেন না—এই অনিশ্চিত অপেক্ষার যন্ত্রণা মৃত্যুর চেয়েও ভয়াবহ।

বিগত ১৬ বছরের শাসনামলে বাংলাদেশে গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও রাষ্ট্রীয় বলপ্রয়োগের যে সংস্কৃতি গড়ে উঠেছিল, তা আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবসে এসে আমাদের বিবেকের কাছে এক বিরাট প্রশ্নচিহ্ন হয়ে দাঁড়ায়।

সম্প্রতি গুম ও নির্যাতনের শিকার পরিবারের স্বজনদের কান্না ও হৃদয়বিদারক অভিজ্ঞতার কথা শুনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আবেগাপ্লুত হওয়া এবং ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়ানোর অঙ্গীকার দেশের রাজনীতি ও সুশাসনে মানবিক সংবেদনশীলতার এক নতুন অধ্যায় সূচনা করেছে।

গুম-সংক্রান্ত তদন্ত কমিশনের অনুসন্ধানে বিগত দেড় দশকে অন্তত ১,৫৬৯টি গুমের ঘটনা নথিভুক্ত হওয়া এবং তার মধ্যে প্রায় ৬৮ শতাংশের বেশি বিরোধী রাজনৈতিক কর্মী ও সাধারণ নাগরিক হওয়া রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহারের করুণ ছবি ফুটিয়ে তোলে।

প্রতিটি গুম হওয়া মানুষের পেছনে রেখে যাওয়া এক একটি ধ্বংসপ্রাপ্ত পরিবার, বাবার স্পর্শ না পাওয়া শিশু কিংবা পুত্রের অপেক্ষায় থাকা বৃদ্ধা মায়ের কান্না কেবল পরিসংখ্যান নয়। রাজনৈতিক ভিন্নমত দমনে গুমকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার মানসিকতা একটি স্বাধীন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের চেতনার পরিপন্থী।

গুমের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনা না করে নিরপেক্ষ তদন্ত ও যথাযথ প্রমাণের ভিত্তিতে আইনের আওতায় আনতে হবে। কিন্তু এই বিচার কোনোভাবেই রাজনৈতিক প্রতিহিংসামূলক হওয়া যাবে না; বরং আইন ও ন্যায়বিচারের স্বচ্ছ নীতিতে সম্পন্ন হতে হবে।

অতীতের কালো অধ্যায় যেন আর কখনো ফিরে না আসে, সেজন্য কেবল মৌখিক প্রতিশ্রুতি নয়, বরং আইনি ও কাঠামোগত নিরাপত্তা বলয় তৈরি করা অপরিহার্য।

২০২৬ সালে মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের অপেক্ষায় থাকা ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন’-এর মাধ্যমে গুমকে একটি স্বতন্ত্র, জামিন-অযোগ্য ও আমলযোগ্য অপরাধ হিসেবে ঘোষণার উদ্যোগ অত্যন্ত যুগান্তকারী।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ক্ষমতার অপব্যবহার বন্ধে এবং যেকোনো বেআইনি আটক বা তুলে নেওয়ার ঘটনা রোধে প্রাতিষ্ঠানিক নজরদারি ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি।

গুমের শিকার পরিবারগুলোর প্রতি রাষ্ট্রের দায়িত্ব শুধু সমবেদনা প্রকাশে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। পরিবারগুলোকে সত্য জানাতে হবে, ভুক্তভোগীদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হবে এবং গুমের কালচার সম্পূর্ণ চিরতরে মুছে ফেলতে হবে। যে মায়ের চোখের পানি বছরের পর বছর ঝরেছে, তার চোখের পানির মূল্য দেওয়ার একমাত্র উপায় হলো একটি ন্যায়ভিত্তিক, নিরাপদ ও মানবিক বাংলাদেশ গড়ে তোলা। রাষ্ট্রকে স্পষ্ট বার্তা দিতে হবে—কোনো নাগরিকের নিরাপত্তা ও জীবনই ক্ষমতার দাপটে বিলীন হতে দেওয়া হবে না।

লেখক: রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান, বিশিষ্ট কলামিস্ট, রাজনীতিবিদ ও রাষ্ট্রচিন্তক।

Related News

বাংলাদেশ ব্যাংকের ওয়েবসাইট বন্ধ: সাইবার নিরাপত্তায় লাল সংকেত নাকি সময়োচিত সতর্কতা? -রোটারিয়ান এম নাজমুল হাসান

বৈশ্বিক সাইবার ঝুঁকিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের ওয়েবসাইট বন্ধের নেপথ্য কারণ ও প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ নিয়ে রোটারিয়ান এম নাজমুল হাসানের বিশেষ কলাম।

প্রধানমন্ত্রীর খুলনা-বাগেরহাট সফর সম্পন্ন; আঞ্চলিক বাণিজ্য-বিনিয়োগ বৃদ্ধির প্রত্যাশা রোটারিয়ান এম নাজমুল হাসান

খুলনা ও বাগেরহাটে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সফর সমাপ্তি, মোংলা বন্দর ও অর্থনৈতিক অঞ্চলের সম্ভাবনা নিয়ে রোটারিয়ান এম নাজমুল হাসানের বিশেষ কলাম।

মোংলা থেকে উপকূলের জাগরণ — প্রধানমন্ত্রীর সফর কেন গুরুত্বপূর্ণ রোটারিয়ান এম নাজমুল হাসান

খুলনা ও বাগেরহাটে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মোংলা বন্দর ও সুন্দরবন সফর নিয়ে বিশিষ্ট কলামিস্ট রোটারিয়ান এম নাজমুল হাসানের বিশ্লেষণাত্মক কলাম।

ধর্ম যার যার, রাষ্ট্র সবার — সম্প্রীতির বাংলাদেশ রোটারিয়ান এম নাজমুল হাসান

মহানবমীতে তিন বিভাগে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ঐতিহাসিক পূজা মণ্ডপ সফর ও সম্প্রীতির বার্তা নিয়ে রোটারিয়ান এম নাজমুল হাসানের বিশেষ কলাম।

নাগরিকত্বই পরিচয়, ধর্ম নয় – তারেক রহমানের নতুন বাংলাদেশের বার্তা। -রোটারিয়ান এম নাজমুল হাসান

প্রধানমন্ত্রীর দুর্গোৎসব সফর, সেনাবাহিনীতে ওআরওপি সুবিধা এবং বর্তমান রাষ্ট্রদর্শন নিয়ে বিশিষ্ট কলামিস্ট রোটারিয়ান এম নাজমুল হাসানের নিবন্ধ।

জাতীয় স্বার্থ, সার্বভৌমত্ব ও আত্মমর্যাদাই আগামীর বাংলাদেশের মূল অঙ্গীকার: প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বক্তব্যের তাৎপর্য- রোটারিয়ান এম নাজমুল হাসান।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বক্তব্যে জাতীয় স্বার্থ, সার্বভৌমত্ব ও আত্মমর্যাদার দিক নির্দেশনার তাৎপর্য বিশ্লেষণ করে রোটারিয়ান এম নাজমুল হাসানের নিবন্ধ।

ব্যাংককে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সম্মেলনের শেষ দিন আজ, ২০২৭ সালের চেয়ারম্যানশিপ পেল পাকিস্তান

থাইল্যান্ডে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক বার্ষিক সভা শেষ। ২০২৭ সালের বোর্ড অব গভর্নরসের চেয়ারম্যানশিপ পেল পাকিস্তান। ব্যাংকক থেকে রিপোর্ট।

ব্যাংককে বিশ্ব অর্থনীতির নতুন দিগন্ত: সংস্কারের শর্তে বাংলাদেশের সামনে ৪.৫ বিলিয়ন ডলারের সুযোগ-রোটারিয়ান এম নাজমুল হাসান

ব্যাংককে বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ সম্মেলনে বাংলাদেশের ৪.৫ বিলিয়ন ডলার ঋণ ও অর্থনৈতিক সংস্কার নিয়ে বিশিষ্ট কলামিস্ট রোটারিয়ান এম নাজমুল হাসানের বিশেষ কলাম।

Search