২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে ১ ট্রিলিয়ন ডলারের বৃহৎ অর্থনীতিতে রূপান্তর করার যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, তা কেবল একটি রাজনৈতিক স্লোগান নয়; বরং আন্তর্জাতিক বাস্তবতার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ এক সুনির্দিষ্ট ও সুপরিকল্পিত অর্থনৈতিক রূপরেখা। বিশ্বব্যাপী ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, সরবরাহ ব্যবস্থার বিঘ্ন এবং মূল্যস্ফীতির এই কঠিন সময়ে বাংলাদেশের অর্থনীতির আকার দ্বিগুণ করার সিদ্ধান্ত দেশের কৌশলগত প্রবৃদ্ধির সক্ষমতাকে নির্দেশ করে।
ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডের (ইআরএল) আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণ প্রকল্পের জন্য ইসলামি উন্নয়ন ব্যাংকের (আইএসডিবি) ১০০ কোটি ডলারের (১,০০৪.২৯ মিলিয়ন মার্কিন ডলার) ঐতিহাসিক অর্থায়ন চুক্তি এই বড় অর্থনৈতিক ভিশন বাস্তবায়নের পথে এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি।
তৈরি পোশাক খাতের পাশাপাশি ইলেকট্রনিক্স, ওষুধশিল্প, হালকা প্রকৌশল ও সবুজ শিল্পকে প্রবৃদ্ধির মূল চালিকাশক্তি হিসেবে গড়ে তোলার যে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, তা দেশের একক-রপ্তানি নির্ভরতা কমিয়ে টেকসই অবকাঠামো গঠনে বড় ভূমিকা রাখবে।
জ্বালানি নিরাপত্তা হলো শিল্পায়ন ও ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি অর্জনের মূল পূর্বশর্ত। চট্টগ্রামভিত্তিক ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডের দ্বিতীয় ইউনিট স্থাপন ও আধুনিকায়ন এ খাতের আমূল পরিবর্তন আনবে।
শোধনাগার সক্ষমতা বৃদ্ধি: প্রকল্পটি সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে বিপিসির বার্ষিক অপরিশোধিত জ্বালানি তেল পরিশোধন ক্ষমতা ১.৫ মিলিয়ন মেট্রিক টন থেকে তিন গুণ বেড়ে ৪.৫ মিলিয়ন মেট্রিক টনে উন্নীত হবে।
*বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয় ও পরিবেশ রক্ষা: পরিশোধিত তেলের অতিরিক্ত আমদানি নির্ভরতা হ্রাসের পাশাপাশি দেশে পরিবেশবান্ধব ইউরো-৫ মানসম্পন্ন জ্বালানি উৎপাদিত হবে, যা জাতীয় রাজস্ব সাশ্রয়ে সরাসরি ভূমিকা রাখবে।
উন্নয়নকে কেবল গুটিকয়েক মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে সর্বজনীন করতে সরকারের সামাজিক সুরক্ষা বলয় সম্প্রসারণ একটি দূরদর্শী পদক্ষেপ। ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ডের পাশাপাশি হেলথ কার্ড চালুর উদ্যোগ মানুষের জীবনযাত্রার মান বাড়াবে।
অর্থনৈতিক বহুমুখীকরণ ও মর্যাদাপূর্ণ কর্মসংস্থান: শুধু উচ্চ প্রবৃদ্ধি নয়, বরং মানসম্মত কর্মসংস্থান তৈরির মাধ্যমে উৎপাদন খাতে বৈচিত্র্য আনা এবং বাংলাদেশকে আঞ্চলিক ‘ম্যানুফ্যাকচারিং হাব’-এ পরিণত করার নীতি বৈশ্বিক বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করবে।
আইএসডিবি ও ‘আইসিএফ’ সুবিধা: আইডিবির ইসলামিক কনসেশনাল ফান্ড সহ স্বল্প সুদের উন্নয়ন তহবিল ব্যবহারে বাংলাদেশের সক্রিয় অংশীদারিত্ব বৈশ্বিক অর্থায়নের চাপ কমাতে সহায়ক হবে।
১ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির চূড়ায় পৌঁছাতে হলে অর্থনৈতিক শৃঙ্খলা বজায় রাখা, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা নিরসন এবং উন্নয়ন প্রকল্প নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শেষ করা অপরিহার্য। আইএসডিবির মতো আন্তর্জাতিক আর্থিক সংস্থার সাথে ফলাফলভিত্তিক অংশীদারিত্ব জোরদার করে জ্বালানি ও শিল্প অবকাঠামোকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতে পারলে আগামী দশকেই বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশ একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে স্থান করে নেবে।
লেখক: রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান, বিশিষ্ট কলামিস্ট, রাজনীতিবিদ ও রাষ্ট্রচিন্তক।