জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় দূরদর্শী পরিকল্পনা ও জাতীয় আস্থার গুরুত্ব : রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান
বিএনপির ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বক্তব্য ও জ্বালানি সংকট সমাধানের মহাপরিকল্পনার ওপর বিশেষ সম্পাদকীয়।
সন্তানকে ভালোবেসে সারাজীবনের অর্জিত সম্পত্তি লিখে দেওয়ার পর সেই সন্তান কর্তৃকই বৃদ্ধ পিতা-মাতাকে গৃহহীন করে রাস্তায় কিংবা বৃদ্ধাশ্রমে ঠেলে দেওয়ার খবর আমাদের সমাজে নতুন নয়। এই মানবিক ট্র্যাজেডি ও সামাজিক অবক্ষয় রোধে জাতীয় সংসদে পাস হওয়া ১৮৮২ সালের দ্য ট্রান্সফার অব প্রোপার্টি (অ্যামেন্ডমেন্ট) বিল এক যুগান্তকারী ও বহুল আলোচিত আইনি পদক্ষেপ।
এই সংশোধনী আইন অনুযায়ী, পিতামাতা বা পিতামহ-মাতামহ তাদের সন্তান বা নাতি-নাতনিকে (বা বিপরীতক্রমে) এবং স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সম্পত্তি দান করার পরও দাতা নিজে জীবিত থাকা পর্যন্ত সেই সম্পত্তির পূর্ণ ভোগাধিকার রক্ষা করতে পারবেন। অর্থাৎ, জীবনকালে দাতাকে তার সম্পত্তি থেকে উচ্ছেদ করা যাবে না। সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে বিএনপি সরকার এই বিলটির পক্ষে দৃঢ় অবস্থান নিলেও, এটি ইসলামী শরিয়াহর বিধানের সাথে সাংঘর্ষিক হতে পারে—এমন অভিযোগে বিরোধী দল সংসদে তীব্র আপত্তি জানিয়েছে।
আইনটির যৌক্তিকতা এবং উভয়পক্ষের উদ্বেগের নিবিড় মূল্যায়ন এখন জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আইনটি পাসের পক্ষে সরকারের প্রধান ভিত্তি হলো দেশের বিদ্যমান সামাজিক বাস্তবতা। অনেক সময় পিতা-মাতা আবেগ কিংবা ভালোবাসার বশবর্তী হয়ে জীবিত থাকা অবস্থাতেই নিজেদের নামে থাকা সব স্থাবর সম্পত্তি সন্তানদের নামে দান বা হেবা করে দেন। কিন্তু সম্পত্তি হস্তান্তরের পর বেশ কিছু ক্ষেত্রে সন্তানরা দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণ শুরু করে এবং একপর্যায়ে অসহায় পিতা-মাতাকেই নিজ বাড়ি থেকে বের করে দেয়।
এমন দুঃখজনক পরিস্থিতি থেকে বয়োবৃদ্ধ নাগরিকদের মানবিক সুরক্ষা দিতে এবং তাদের অধিকার অক্ষুণ্ণ রাখতে একটি আইনগত ভিত্তি থাকা জরুরি ছিল। সুনির্দিষ্ট আইন না থাকায় এতদিন এমন ভুক্তভোগী পিতা-মাতার আইনি প্রতিকার পাওয়ার সুযোগ ছিল সীমিত। সরকার প্রস্তাবিত এই নতুন বিধানের মাধ্যমে নিশ্চিত করতে চেয়েছে যেন দাতার জীবনকালে তার অধিকার ক্ষুণ্ণ না হয় এবং তিনি মাথা গোঁজার ঠাঁই না হারান। আইনের বিচারে এটি একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল ও ইতিবাচক আইনি নিরাপত্তা বলয়।
অন্যদিকে, বিরোধী দল এবং ধর্মীয় বিশেষজ্ঞদের মূল উদ্বেগের জায়গাটি হলো ইসলামি উত্তরাধিকার ও দান সংক্রান্ত আইনের মৌলিক ধারা। শরিয়াহর বিধান অনুযায়ী, ইসলামে ‘হেবা’ বা দানের ক্ষেত্রে শর্তহীন মালিকানা হস্তান্তর একটি অন্যতম শর্ত। ইসলামী আইনে দান সম্পূর্ণ হওয়ার জন্য তিনটি ধাপ আবশ্যক: প্রস্তাব, গ্রহণ এবং সম্পত্তির তাৎক্ষণিক দখল বা হস্তান্তর।
যখনই দাতা সম্পত্তির দখল গ্রহীতাকে বুঝিয়ে দেন, তখনই তার ওপর গ্রহীতার পূর্ণ স্বত্ব সৃষ্টি হয়। ফলে, সম্পত্তি হস্তান্তরের পর দাতার জীবনকালীন ভোগাধিকার ধরে রাখার বিষয়টি সাধারণ হেবা আইনের মূলনীতির সাথে মিলানো কঠিন হয়ে পড়ে। বিরোধী দলের নেতাদের মতে, সামাজিক সমস্যার সমাধান অবশ্যই করতে হবে, তবে তা করতে গিয়ে ইসলামি অনুশাসন বা কোরআন-সুন্নাহর মূলনীতিকে পাশ কাটানোর সুযোগ নেই। এটি ধর্মীয় অনুভূতি এবং পারিবারিক উত্তরাধিকার ব্যবস্থার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে বলে তারা আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
তবে আইনি ও সামাজিক দৃষ্টিকোণ থেকে পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, সরকার ও আইন মন্ত্রণালয়ের ব্যাখ্যায় এই বিতর্কের একটি আইনি উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে।
আইনমন্ত্রীর দেওয়া স্পষ্টীকরণ অনুযায়ী, এই সংশোধনী সাধারণ মুসলিম আইনের অধীন ‘হেবা’ বা ধর্মীয় আইনের দ্বারা স্বীকৃত দান ব্যবস্থাকে একেবারেই স্পর্শ করে না। অর্থাৎ, কেউ যদি সম্পূর্ণ ধর্মীয় শরিয়াহ মেনে ঐতিহ্যবাহী ‘হেবা’ প্রক্রিয়ায় সম্পত্তি দান করতে চান, তবে তিনি আগের মতোই তা করতে পারবেন এবং সেই বিধানে কোনো পরিবর্তন আসবে না। কিন্তু এটি সম্পত্তি হস্তান্তরের একটি ‘স্বতন্ত্র ও নতুন পদ্ধতি’ হিসেবে যুক্ত হলো, যা সিভিল আইনের অধীন দেশের সব ধর্মের নাগরিকদের ক্ষেত্রে সমানভাবে প্রযোজ্য হবে। যে পিতা-মাতা মনে করবেন যে ভবিষ্যতে তাদের আবাসস্থল বা ভোগাধিকার নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে, তারা সাধারণ হেবার পরিবর্তে এই নতুন আইনি কাঠামোর অধীনে জীবনকালীন ভোগাধিকার সংরক্ষণ করে সম্পত্তি দান করতে পারবেন।
কেউ যদি সম্পূর্ণ ধর্মীয় শরিয়াহ মেনে ঐতিহ্যবাহী ‘হেবা’ প্রক্রিয়ায় সম্পত্তি দান করতে চান, তবে তিনি আগের মতোই তা করতে পারবেন এবং সেই বিধানে কোনো পরিবর্তন আসবে না। কিন্তু এটি সম্পত্তি হস্তান্তরের একটি ‘স্বতন্ত্র ও নতুন পদ্ধতি’ হিসেবে যুক্ত হলো, যা সিভিল আইনের অধীন দেশের সব ধর্মের নাগরিকদের ক্ষেত্রে সমানভাবে প্রযোজ্য হবে
সুতরাং, সার্বিক মূল্যায়নে দেখা যায় যে আইনটির মূল উদ্দেশ্য হলো পিতা-মাতার মৌলিক অধিকার ও নিরাপত্তা রক্ষা করা, যা ইসলামসহ যেকোনো ধর্মে ও সভ্য সমাজে নৈতিকভাবে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পায়। সামাজিক অপরাধ ও মানবিক নিষ্ঠুরতা বন্ধে রাষ্ট্রের আইন প্রণয়ন করার দায়িত্ব রয়েছে। তবে একই সাথে, এই আইনটি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে যেন কোনো প্রকার অস্পষ্টতা বা সাধারণ শরিয়াহ আইনের সাথে বিভ্রান্তি তৈরি না হয়, সেদিকে নজর রাখা জরুরি।
জনমনে যেন ধর্মীয় আইন লঙ্ঘনের কোনো ভুল ধারণা তৈরি না হয়, সেজন্য বিচার বিভাগ ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে আইনটির প্রয়োগক্ষেত্র সম্পর্কে স্পষ্ট বার্তা দিতে হবে। পিতা-মাতার অধিকার রক্ষা এবং ধর্মীয় অনুশাসনের প্রতি সম্মান—এই দুইয়ের সমন্বয়ে একটি সচেতন ও সংবেদনশীল সমাজ গঠনে আইনটি ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে বলেই আশা করা যায়।
লেখক: রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান, বিশিষ্ট কলামিস্ট, রাজনীতিবিদ ও রাষ্ট্রচিন্তক।