আন্তর্জাতিক: কলকাতায় হোটেল ও গেস্টহাউসে অগ্নিনিরাপত্তা অভিযান জোরদার হওয়ার পর চিকিৎসার জন্য শহরটিতে যাওয়া বাংলাদেশি রোগী ও তাঁদের স্বজনেরা আবাসন সংকটে পড়েছেন। কম খরচের বহু হোটেল-গেস্টহাউস বন্ধ হয়ে যাওয়ায় অনেকে বাধ্য হচ্ছেন বেশি ভাড়ার আবাসনে উঠতে। কেউ কেউ হাসপাতালের আশপাশে রাত কাটানোর জায়গাও পাচ্ছেন না।
সম্প্রতি নেত্রকোনার মহম্মদ রফিকুল তাঁর ক্যানসার আক্রান্ত বড় ভাই সফিকুলকে চিকিৎসার জন্য কলকাতায় নিয়ে গিয়ে এমন পরিস্থিতির মুখে পড়েন। কেমোথেরাপি নেওয়ার পর আরও কয়েকটি পরীক্ষা করানোর জন্য কয়েক দিন থাকার পরিকল্পনা ছিল তাঁদের। কিন্তু অগ্রিম টাকা পরিশোধ করেও প্রথম রাতেই গেস্টহাউস ছাড়তে হয় তাঁদের। রাত সাড়ে ১০টার দিকে মালপত্রসহ বের করে দেওয়ার পর বাধ্য হয়ে ফুটপাতে রাত কাটানোর ব্যবস্থা করেন তাঁরা।
পরদিন আশপাশের বিভিন্ন হোটেল ও গেস্টহাউসে খোঁজ করেও সহজে থাকার জায়গা মেলেনি। যেসব আবাসন চালু রয়েছে, সেগুলোর অনেকগুলোর ভাড়া বেড়ে গেছে বলে রোগী ও স্বজনেরা জানিয়েছেন।
কলকাতায় ১৯ আগস্ট একটি আবাসিক হোটেলে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে নয়জন নিহত হওয়ার পর শহরজুড়ে হোটেল ও গেস্টহাউসের অগ্নিনিরাপত্তা নিয়ে অভিযান শুরু করে কলকাতা পৌর করপোরেশন (কেএমসি), পশ্চিমবঙ্গ ফায়ার অ্যান্ড ইমার্জেন্সি সার্ভিসেস এবং কলকাতা পুলিশ।
কেএমসির হিসাবে, ৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৯৬০টি হোটেল ও গেস্টহাউস পরিদর্শন করা হয়েছে। এর মধ্যে ৯১৯টিকে সাময়িকভাবে বন্ধের নোটিশ দেওয়া হয়েছে। মাত্র ৪১টি প্রতিষ্ঠানকে নির্ধারিত অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থার ক্ষেত্রে compliant বা নিয়ম মেনে চলা হিসেবে পাওয়া গেছে।
কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বন্ধের নোটিশ পাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোকে অগ্নিনিরাপত্তার ঘাটতি পূরণ করে পুনরায় লাইসেন্সের জন্য আবেদন করতে হবে। তবে আবাসিক ভবনকে অবৈধভাবে ভাগ করে গেস্টহাউস হিসেবে ব্যবহার করা প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষেত্রে পুনরায় অনুমোদনের সুযোগ না দেওয়ার কথাও জানিয়েছে কেএমসি।
কলকাতার নিউ মার্কেট, পার্ক স্ট্রিট, মারকুইস স্ট্রিট, সদর স্ট্রিট, ফ্রি স্কুল স্ট্রিট, লিন্ডসে স্ট্রিট ও কলিন লেন এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে কম খরচের অসংখ্য হোটেল ও গেস্টহাউস গড়ে উঠেছে। বাংলাদেশ থেকে চিকিৎসার জন্য আসা রোগী ও তাঁদের স্বজনদের বড় একটি অংশ এসব আবাসনে থাকতেন।
অগ্নিনিরাপত্তা অভিযানের পর এসব এলাকার অনেক আবাসন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সাশ্রয়ী থাকার জায়গার সংকট তৈরি হয়েছে। ফলে সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়ছেন সীমিত সামর্থ্যের রোগী ও তাঁদের স্বজনেরা।
ইস্টার্ন মেট্রোপলিটান বাইপাসসংলগ্ন ডি’সান, মণিপাল, পিয়ারলেস, নারায়ণা আর এন টেগোর, রুবি ও ফর্টিসের মতো হাসপাতাল এলাকায়ও বাংলাদেশি রোগীদের জন্য কম খরচের আবাসনের চাহিদা রয়েছে। কিন্তু সেখানেও আবাসন সংকট তৈরি হওয়ায় চিকিৎসা ব্যয় আরও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
১৯ আগস্ট কলকাতার মির্জা গালিব স্ট্রিটের শিখা ইন হোটেলে আগুনে নয়জন নিহত হন। তাঁদের মধ্যে সাতজন বাংলাদেশি নাগরিক ছিলেন। নিহতদের কয়েকজন চিকিৎসার জন্য কলকাতায় গিয়েছিলেন।
ঘটনার পর হোটেলটির অগ্নিনিরাপত্তা ও অনুমোদন নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। এরপর কলকাতা শহরের হোটেল ও গেস্টহাউসগুলোর বৈধতা এবং অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা যাচাইয়ে বড় ধরনের অভিযান শুরু হয়।
কেএমসি কমিশনার স্মিতা পান্ডে জানিয়েছেন, অগ্নিনিরাপত্তার ক্ষেত্রে কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া হবে না। কর্তৃপক্ষের ভাষ্য, যেসব ভবনে নিরাপত্তা বিধি পূরণ করা সম্ভব, সেগুলোর মালিকদের প্রয়োজনীয় সংস্কার করে পুনরায় অনুমোদনের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে।
আবাসন সংকটের প্রভাব পড়ছে কলকাতার চিকিৎসা খাতেও। বাংলাদেশি রোগীদের একটি বড় অংশ কম খরচের হোটেল-গেস্টহাউসের ওপর নির্ভর করায় এসব আবাসন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় হাসপাতালগুলোর রোগীসেবা ব্যবস্থার বাইরেও অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়েছে।
এ পরিস্থিতিতে কলকাতার কয়েকটি বেসরকারি হাসপাতাল অনুমোদিত গেস্টহাউস ও হোটেলের সঙ্গে যোগাযোগ করে রোগীদের থাকার ব্যবস্থা করার উদ্যোগ নিয়েছে। চিকিৎসার জন্য কলকাতায় আসার আগে রোগীদের আবাসন নিশ্চিত করার পরামর্শও দেওয়া হচ্ছে।
কিছু হাসপাতাল বাংলাদেশি রোগীদের আস্থা ফেরাতে বাংলাদেশে নিজেদের প্রতিনিধিদল পাঠিয়ে চিকিৎসা ও থাকার ব্যবস্থা সম্পর্কে তথ্য দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
কলকাতা কর্তৃপক্ষের অভিযানের মূল লক্ষ্য অগ্নিনিরাপত্তা নিশ্চিত করা। ৯১৯টি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পরও কেএমসি জানিয়েছে, শহরের আরও হাজার হাজার হোটেল ও গেস্টহাউস পরিদর্শন করা হবে। কলকাতায় মোট প্রায় ৩ হাজার ৭০০ হোটেল ও গেস্টহাউস রয়েছে বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
তবে নিরাপত্তা ব্যবস্থা কঠোর করার পাশাপাশি চিকিৎসার জন্য আসা বিদেশি রোগীদের জন্য সাশ্রয়ী ও বৈধ আবাসনের ব্যবস্থা নিশ্চিত করাও এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে বাংলাদেশি রোগীদের ক্ষেত্রে হাসপাতাল, প্রশাসন ও আবাসন ব্যবসায়ীদের মধ্যে সমন্বিত উদ্যোগ না হলে চিকিৎসা নিতে এসে অতিরিক্ত আবাসন ব্যয়ের চাপ তৈরি হতে পারে।