সম্পাদকীয়

শব্দ ও বায়ু দূষণের মহাবিপর্যয় রোধে চাই সমন্বিত মহাপরিকল্পনা : রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান

রাজধানী ঢাকা এখন এক বাস-অযোগ্য মেগাসিটিতে পরিণত হওয়ার চূড়ান্ত সীমায় এসে দাঁড়িয়েছে। বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত বায়ুর শহরের তালিকায় ঢাকার শীর্ষস্থান দখল করা এখন আর কোনো নতুন খবর নয়, বরং এটি আমাদের নিত্যদিনের নির্মম বাস্তবতা। বায়ুর পাশাপাশি যুক্ত হয়েছে অসহনীয় শব্দ দূষণ।

এই দুই নীরব ঘাতক মিলে ঢাকার প্রায় দুই কোটি মানুষের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যকে চরম ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। ঢাকা শহরের এই ভয়াবহ শব্দ ও বায়ু দূষণের বর্তমান চিত্র, এর পেছনের মূল কারণ এবং তা থেকে পরিত্রাণের উপায় নিয়ে এখন গভীরভাবে ভাবার সময় এসেছে।

আন্তর্জাতিক বায়ুমান সূচক (AQI) অনুযায়ী, শুষ্ক মৌসুমে ঢাকার বায়ুমান প্রায়ই ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ বা ‘অস্বাস্থ্যকর’ (২০০ থেকে ৩০০-এর উপরে) ক্যাটাগরিতে থাকে, যা সহনীয় মাত্রার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি।

অন্যদিকে, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) মতে আবাসিক এলাকায় শব্দের সহনীয় মাত্রা ৫৫ ডেসিবেল হলেও, ঢাকার প্রধান সড়ক ও বাণিজ্যিক এলাকাগুলোতে শব্দের মাত্রা প্রতিনিয়ত ৯০ থেকে ১১০ ডেসিবেল ছাড়িয়ে যাচ্ছে।

ঢাকা শহরজুড়ে বছরব্যাপী চলা অপরিকল্পিত মেগা প্রকল্প, রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি এবং ভবন নির্মাণের সময় কোনো ধরনের সুরক্ষামূলক ব্যবস্থা না রাখায় বাতাসে পিএম ২.৫ কণার পরিমাণ মারাত্মকভাবে বেড়ে যায় নগরীতে চলাচলকারী হাজার হাজার ফিটনেসবিহীন বাস, ট্রাক ও লেগুনা থেকে নির্গত কালো ধোঁয়া বায়ুকে বিষাক্ত করে তুলছে। এছাড়াও ঢাকার চারপাশ ঘিরে থাকা শত শত সনাতন পদ্ধতির ইটভাটা এবং শিল্পকারখানার বর্জ্য ও ধোঁয়া এই শহরের বাতাসকে প্রতিনিয়ত দূষিত করছে।

অন্যদিকে চালকদের মধ্যে যত্রতত্র এবং অপ্রয়োজনে উচ্চ শব্দে হর্ন বাজানোর প্রবণতা, বিশেষ করে নিষিদ্ধ হাইড্রোলিক হর্নের যথেচ্ছ ব্যবহার শব্দ দূষণের প্রধান কারণ।

ঢাকাকে একটি সুস্থ ও বাসযোগ্য নগরী হিসেবে গড়ে তুলতে হলে সরকারকে জরুরি ভিত্তিতে এবং কঠোরভাবে কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।

যেকোনো সরকারি বা বেসরকারি নির্মাণকাজে আবশ্যিকভাবে সেফটি নেট ব্যবহার এবং নিয়মিত পানি ছিটানো বাধ্যতামূলক করতে হবে। আইন অমান্যকারীদের ভারী জরিমানার আওতায় আনতে হবে।

শহরের রাস্তা থেকে শতভাগ কালো ধোঁয়া নির্গতকারী এবং ফিটনেসবিহীন যানবাহন অপসারণ করতে হবে। সরকারি গণপরিবহন ব্যবস্থাকে আধুনিক ও পরিবেশবান্ধব (যেমন: ইলেকট্রিক বা সিএনজিচালিত বাস) করতে হবে।

ঢাকার চারপাশের পরিবেশ দূষণকারী ইটভাটাগুলো বন্ধ করে পরিবেশবান্ধব ব্লক ইটের ব্যবহার বাধ্যতামূলক করতে হবে।

শব্দ দূষণ কমাতে বিনা প্রয়োজনে হর্ন বাজানো নিষিদ্ধ করতে হবে।  শহরের হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও আবাসিক এলাকাগুলোকে কঠোরভাবে ‘নো হর্ন’ জোন হিসেবে কার্যকর করতে হবে। নিষিদ্ধ হাইড্রোলিক হর্ন আমদানি ও বিক্রি পুরোপুরি বন্ধ করে নিয়মিত মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে চালকদের জরিমানা ও শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।

এছাড়াও ঢাকার ছাদবাগান, পার্ক ও রাস্তার পাশে গাছ লাগিয়ে সবুজায়ন বাড়াতে হবে। একই সাথে বায়ু ও শব্দ দূষণের ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে চালক ও সাধারণ নাগরিকদের মাঝে ব্যাপক সচেতনতা তৈরি করতে হবে।

ঢাকা শহরের এই পরিবেশগত সংকট আর অবহেলার পর্যায়ে নেই। এখনই যদি সমন্বিত এবং দীর্ঘমেয়াদী মহাপরিকল্পনা নিয়ে এই দুই দূষণ রোধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া না হয়, তবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এক পঙ্গু ও অসুস্থ ঢাকা অপেক্ষা করছে। ঢাকাকে বাঁচাতে হলে আইনের কঠোর প্রয়োগ ও নাগরিক সচেতনতার কোনো বিকল্প নেই।

লেখক: রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান, বিশিষ্ট লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।

Related News

দক্ষিণ চট্টগ্রামে বন্যা-পরবর্তী পুনর্বাসন, প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদী ও পরিকল্পিত রোডম্যাপ : রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান

দক্ষিণ চট্টগ্রামে ভয়াবহ বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত ৭ লাখ মানুষের পুনর্বাসন ও টেকসই অবকাঠামো নির্মাণে সরকারের উদ্যোগ এবং বেসরকারি খাতের ভূমিকা নিয়ে একটি বিশেষ সম্পাদকীয় প্রতিবেদন।

ধর্মীয় অনুভূতির অপব্যবহার প্রতিরোধ ও অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ আমাদের প্রত্যাশা : রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান

সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহ উদ্দিন আহমদের গুরুত্বপূর্ণ ব্রিফিং। আরবি হরফ লেখা পতাকা, শেখ হাসিনাকে দেশে ফেরানোর উদ্যোগ ও শহীদদের তালিকা নিয়ে রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসানের বিশেষ কলাম।

‘ইউনিভার্সাল কার্ড’ করুণা নয়, রাষ্ট্রের দায় মেটানোর যুগান্তকারী ইশতেহার : রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান

বাজেট অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান কর্তৃক কৃষক, ফ্যামিলি ও প্রবাসী কার্ড একীভূত করে ‘ইউনিভার্সাল কার্ড’ চালুর ঐতিহাসিক ঘোষণা। রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসানের বিশেষ কলাম।

বন্যা মোকাবিলা ও ক্ষতিগ্রস্তদের টেকসই পুনর্বাসনে সরকারের করণীয় : রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান

দেশের সার্বিক বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় উদ্ধার অভিযান, স্বচ্ছ ত্রাণ বিতরণ এবং বন্যা-পরবর্তী পুনর্বাসন নিয়ে রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসানের বিশেষ সম্পাদকীয় কলাম।

স্থায়ী কমিটির নীতি-কৌশল ও নতুন বাংলাদেশ, ইশতেহার বাস্তবায়ন এবং কূটনৈতিক সাফল্যের এক সুসংহত চালচিত্র : রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সভার বিশ্লেষণ। নির্বাচনী ইশতেহার, চীন-মালয়েশিয়া সফর ও জাতিসংঘে বাংলাদেশের অর্জন নিয়ে রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসানের বিশেষ কলাম।

মানবিক চিকিৎসাসেবা ও স্বাস্থ্য খাতের আধুনিকায়ন, আস্থা পুনর্গঠনে সরকারের যুগান্তকারী রোডম্যাপ : রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান

ঢামেকের ৮১তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ঐতিহাসিক বক্তব্য। ১ লাখ স্বাস্থ্যকর্মী ও ৫ হাজার চিকিৎসক নিয়োগসহ স্বাস্থ্য খাতের রূপান্তরে বিশেষ কলাম।

আকস্মিক বন্যা মোকাবিলায় প্রধানমন্ত্রীর তড়িৎ নির্দেশনা এবং আমাদের সম্মিলিত দায়িত্ব : রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান

সারাদেশে ভারী বর্ষণ ও বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে দাঁড়াতে প্রশাসন ও নেতা-কর্মীদের কড়া নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসানের বিশেষ কলাম।

স্নাতক পর্যন্ত অবৈতনিক নারী শিক্ষা সহায়তার ঘোষণা, এক সুদূরপ্রসারী ও সাম্যবাদী রাষ্ট্রদর্শনের রূপরেখা : এম. নাজমুল হাসান

জাতীয় সংসদে বাজেট অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ঐতিহাসিক ঘোষণা। মেয়েদের স্নাতক পর্যন্ত অবৈতনিক শিক্ষা, বৃত্তি এবং ১ কোটি ২০ লাখ প্রাথমিক শিক্ষার্থীকে পোশাক ও ব্যাগ দেওয়ার পরিকল্পনা।

Search