দক্ষিণ চট্টগ্রামে সাম্প্রতিক ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ বন্যায় প্রায় সাত লাখেরও বেশি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। আকস্মিক ও প্রলয়ংকরী এই প্রাকৃতিক বিপর্যয় কেবল ঘরবাড়িই ধ্বংস করেনি, বরং পুরো অঞ্চলের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড, বিশেষ করে কৃষি ও যোগাযোগ অবকাঠামোকে চরমভাবে বিপর্যস্ত করে তুলেছে।
এই মানবিক সংকটে লোহাগাড়া ও সাতকানিয়ার বন্যাকবলিত এলাকা পরিদর্শন শেষে অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর এই ঘোষণা অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক যে—ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পুনর্বাসনই এখন সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। দুর্যোগের তীব্রতা বিবেচনায় সরকারের পক্ষ থেকে ত্রাণ কার্যক্রমের পাশাপাশি দ্রুত পুনর্বাসন প্রক্রিয়া শুরু করার এই সিদ্ধান্তকে আমরা স্বাগত জানাই।
প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের বিশাল সংখ্যার বিপরীতে ইতোমধ্যে ৪০ হাজার পরিবারকে চাল, ৭৫ হাজার পরিবারকে চাল-ডালসহ শুকনা খাবার এবং ৪০ হাজার পরিবারকে রান্না করা খাবার সরবরাহ করা হয়েছে। তবে সরকারি এই উদ্যোগের পাশাপাশি বেসরকারি খাত এবং ব্যবসায়িক সমাজের এগিয়ে আসা এই সংকটে নতুন আশার আলো ছড়াচ্ছে।
বিশেষ করে, সাতকানিয়ায় বন্যাদুর্গত মানুষের মাঝে তামাকুমন্ডি লেইন বণিক সমিতির খাদ্য ও জরুরি ত্রাণসামগ্রী বিতরণের উদ্যোগটি মানবতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেনের নেতৃত্বে যেভাবে ব্যবসায়ী সমাজ দুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে, তা অত্যন্ত প্রশংসনীয়।
এই ধরনের দুর্যোগে সরকারি ও বেসরকারি খাতের সমন্বিত প্রচেষ্টাই পারে দ্রুত সংকট দূর করতে।
তবে ত্রাণ বিতরণ সাময়িক স্বস্তি দিলেও, প্রকৃত চ্যালেঞ্জ লুকিয়ে আছে দীর্ঘমেয়াদী পুনর্বাসনে। যাদের ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তাদের জন্য টিন সরবরাহ এবং কৃষকদের দ্রুত চাষাবাদে ফিরিয়ে আনতে বীজ, সার ও প্রয়োজনীয় কৃষি উপকরণ দেওয়ার যে প্রতিশ্রুতি অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী দিয়েছেন, তা দ্রুত এবং স্বচ্ছতার সাথে বাস্তবায়ন করতে হবে।
একই সাথে স্থানীয় সরকার বিভাগকে বন্যা-বিধ্বস্ত সড়কগুলোর ক্ষয়ক্ষতি দ্রুত মূল্যায়ন করে সংস্কারকাজ শুরু করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যা যোগাযোগ ব্যবস্থা সচল করতে অত্যন্ত জরুরি।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই ভয়াবহ বন্যার মূল কারণ অনুসন্ধান করা। মন্ত্রী নিজেই স্বীকার করেছেন যে—রেললাইন, অপরিকল্পিত স্থাপনা, পানি চলাচলে প্রতিবন্ধকতা এবং অস্বাভাবিক ভারী বৃষ্টিপাত—সব বিষয়ই তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। এটি একটি অত্যন্ত দূরদর্শী ও বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ।
অতীতে অনেক সময়ই দেখা গেছে, অপরিকল্পিত মেগা প্রজেক্ট বা পানি নিষ্কাশনের পথ বন্ধ করে তৈরি করা স্থাপনা কৃত্রিম বন্যার সৃষ্টি করে।
আমরা আশা করি, এই তদন্ত যেন কেবল কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ না থাকে। একটি পূর্ণাঙ্গ ও বৈজ্ঞানিক মূল্যায়নের ভিত্তিতে দক্ষিণ চট্টগ্রামকে চিরতরে এই বন্যার অভিশাপ থেকে রক্ষা করতে হবে।
পুনর্বাসন কার্যক্রম ক্ষতিগ্রস্তরা স্বাভাবিক জীবনে ফিরে না আসা পর্যন্ত অব্যাহত রাখার পাশাপাশি, ভবিষ্যতে এমন দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি কমাতে একটি টেকসই ও পরিবেশবান্ধব মাস্টারপ্ল্যান গ্রহণ করা এখন সময়ের দাবি।
লেখক: রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান, বিশিষ্ট লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।