বেলারুশ সীমান্ত দিয়ে লিথুয়েনিয়ার আকাশসীমায় ঢোকা ড্রোন ভূপাতিত করল ন্যাটো
বেলারুশ থেকে লিথুয়েনিয়ার আকাশসীমায় প্রবেশ করা একটি ড্রোন ন্যাটোর যুদ্ধবিমান দিয়ে ভূপাতিত করা হয়েছে। রাজধানী ভিলনিয়াসে সতর্কতা জারি করা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক: সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার পর বিদেশি নাগরিকদের মরদেহ পরিবারের কাছে ফেরত দেওয়া হচ্ছে না—এমন অভিযোগ উঠেছে। এর ফলে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের স্বজনেরা প্রিয়জনের মরদেহ ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী দাফন বা শেষকৃত্য করার সুযোগ থেকেও বঞ্চিত হচ্ছেন। মানবাধিকারকর্মীদের অভিযোগ, মরদেহ পরিবারের কাছে না দেওয়া মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তির স্বজনদের ওপরও এক ধরনের শাস্তি চাপিয়ে দেওয়ার শামিল।
বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি বছরের ২৩ জুন দক্ষিণ সৌদি আরবের আসির প্রদেশের খামিস মুশাইত কারাগারে মাদক পাচারের অভিযোগে পাঁচ ইথিওপীয় নাগরিকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। তাঁদের মধ্যে ছিলেন ২৫ বছর বয়সী কিব্রম কিনফে আরেগাউই।
কিব্রমের বাবা কিনফে আরেগাউই জানান, ছেলের মৃত্যুর পর পরিবার প্রতীকীভাবে শেষকৃত্যের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করলেও মরদেহ দেশে ফেরত না আসায় তিনি প্রকৃত অর্থে সান্ত্বনা পাচ্ছেন না।
তিনি বলেন, পরিবারের পক্ষ থেকে ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা পালন করা হলেও ছেলের মরদেহ দেখতে না পাওয়ার কষ্ট আজীবন বয়ে বেড়াতে হবে।
ইথিওপীয় অর্থোডক্স খ্রিস্টান পরিবারগুলোর কাছে ধর্মীয় রীতি মেনে প্রিয়জনের মরদেহ সমাহিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু কিব্রমের পরিবার সেই সুযোগ পায়নি।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ২৭ জুলাই পর্যন্ত এক বছরে সৌদি আরবে ১১৬ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে। মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের সংখ্যার দিক থেকে চীন ও ইরানের পর সৌদি আরব বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ দেশ।
ইউরোপিয়ান সৌদি অর্গানাইজেশন ফর হিউম্যান রাইটসের জ্যেষ্ঠ গবেষক দুয়া ধাইনি বলেন, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পর মরদেহ পরিবারের কাছে ফেরত না দেওয়া কেবল প্রশাসনিক বিষয় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। তাঁর মতে, এর মাধ্যমে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তির পরিবারকেও শাস্তি দেওয়া হয়।
ধর্ম ও বিশ্বাসের স্বাধীনতা বিষয়ক জাতিসংঘের বিশেষ প্রতিবেদক নাজিলা ঘানেয়াও সৌদি আরবে মরদেহ আটকে রাখার অভিযোগকে ‘নির্যাতন ও নিপীড়ন’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
কিব্রম ২০২০ সালে প্রথমবার বৈধ ভিসা ছাড়াই বাবার সঙ্গে সৌদি আরবে যান। পরে তাঁদের গ্রেপ্তার করে ১৫ মাস কারাগারে রাখার পর ইথিওপিয়ায় ফেরত পাঠানো হয়।
ইথিওপিয়ার গৃহযুদ্ধের পর কিব্রম আবার সৌদি আরবে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। লোহিত সাগর পাড়ি দিতে অতিরিক্ত যাত্রীবোঝাই একটি নৌকায় ওঠেন তিনি। এরপর পায়ে হেঁটে ইয়েমেন অতিক্রম করেন।
২০২৩ সালে সৌদি সীমান্ত পার হওয়ার সময় তাকে আবার গ্রেপ্তার করা হয় এবং মাদক পাচারের অভিযোগ আনা হয়। তাঁর বাবার ভাষ্য, প্রায় তিন মাস কারাগারে থাকার পর কিব্রমকে দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। প্রায় তিন বছর কারাগারে থাকার পর চলতি বছরের জুনে হঠাৎ তাঁর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।
কিব্রমের পরিবার দাবি করেছে, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে পরিবারের সঙ্গে কথা বলার সুযোগও পাননি তিনি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছেলের মৃত্যুর খবর জানতে পারেন তাঁর বাবা।
কিনফের দাবি, তাঁর ছেলে মাদক পাচারের সঙ্গে জড়িত ছিলেন—এমন কোনো প্রমাণ পরিবারকে দেওয়া হয়নি। মৃত্যুসনদ, ব্যক্তিগত জিনিসপত্র বা মরদেহ—কোনোটিই তাঁদের হাতে দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ তাঁর।
কিব্রমের সঙ্গে একই দিনে একই কারাগারে ২৬ বছর বয়সী সিগাবু গেব্রেমারিয়ামেরও মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।
ইথিওপিয়ার তিগ্রায় অঞ্চলের একটি গ্রামীণ জেলার আট ভাইবোনের মধ্যে সিগাবু ছিলেন সবার বড়। দারিদ্র্য ও গৃহযুদ্ধ থেকে বাঁচতে ১৮ বছর বয়সের পর তিনি বাড়ি ছেড়েছিলেন। পরিবারের আর্থিক সহায়তার জন্যই তিনি সৌদি আরবে গিয়েছিলেন বলে তাঁর বাবা হাগোস গেব্রেমেস্কেল জানান।
মাদক পাচারের দায়ে দোষী সাব্যস্ত হয়ে সাড়ে তিন বছর কারাগারে ছিলেন সিগাবু। মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে ফেব্রুয়ারিতে পরিবারের সঙ্গে শেষবার কথা হয় তাঁর। সে সময় দেশে ফিরে বিয়ে করার কথা জানিয়েছিলেন তিনি।
সিগাবুর মা লেতেখ্রিস্টোস ছেলের জন্য পাত্রীও খুঁজছিলেন। কিন্তু বিয়ের আয়োজনের বদলে শেষ পর্যন্ত তাঁকে ছেলের প্রতীকী শেষকৃত্যের আয়োজন করতে হয়েছে।
সৌদি আরবে থাকা স্বজনদের কাছ থেকে ছেলের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবর পাওয়ার পর পরিবার স্থানীয় একটি গির্জায় প্রার্থনা ও প্রতীকী শেষকৃত্যের আয়োজন করে। তবে ৪০ দিনের ঐতিহ্যবাহী শোক পালন করলেও মরদেহ দেশে না ফেরায় তাঁদের শোক আরও গভীর হয়েছে বলে জানান সিগাবুর মা।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের গত বছর প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মাদকসংক্রান্ত অপরাধে সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের প্রায় ৭৫ শতাংশই বিদেশি নাগরিক।
দুয়া ধাইনি বলেন, অপরাধী চক্রগুলো প্রায়ই দুর্বল ও ঝুঁকিপূর্ণ মানুষকে মাদক পাচারের কাজে ব্যবহার করে। তাঁর ভাষ্য, ইথিওপিয়ার কিছু মামলায় আটক ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, সীমান্ত পার হওয়ার সহায়তার বিনিময়ে তাঁদের বিভিন্ন জিনিস বহন করতে প্ররোচিত করা হয়েছিল। আবার কিছু পাকিস্তানি নাগরিককে নিষিদ্ধ পদার্থ গিলতে বাধ্য করার ঘটনাও নথিবদ্ধ হয়েছে।
ইউরোপিয়ান সৌদি অর্গানাইজেশন ফর হিউম্যান রাইটসের হিসাব অনুযায়ী, ২০১৫ সালে রাজা সালমান বিন আবদুল আজিজ আল সৌদ ক্ষমতায় আসার পর থেকে সৌদি আরবে ২ হাজারের বেশি মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে। এর মধ্যে ৪২ শতাংশই বিদেশি নাগরিক।
সংস্থাটির হিসাবে, ২০২৫ সালে সৌদি আরবে ৩৫৬ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়, যা এক বছরে দেশটির সর্বোচ্চ মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের রেকর্ড।
সৌদি আইনে দূতাবাসের খরচে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া ব্যক্তির মরদেহ দেশে পাঠানোর সুযোগ রয়েছে। তবে দুয়া ধাইনি দাবি করেন, বাস্তবে বিদেশি মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের মরদেহ পরিবারের কাছে ফেরত দেওয়া হয়েছে—এমন ঘটনা তাঁদের জানা নেই।
অতীতে তুরস্ক ও জর্ডানের কয়েকটি পরিবার মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত স্বজনদের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে নেওয়ার দাবিতে প্রচারণা চালালেও সফল হয়নি বলে জানান তিনি।
বিবিসি সৌদি আরবের স্বরাষ্ট্র ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং লন্ডনে দেশটির দূতাবাসের কাছে এ বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলেও প্রতিবেদন প্রকাশের সময় পর্যন্ত কোনো জবাব পাওয়া যায়নি। ইথিওপিয়ার সৌদি দূতাবাসের কাছেও মন্তব্য চাওয়া হয়েছে।
সৌদি আরবে বর্তমানে কতজন বন্দী মৃত্যুদণ্ডের অপেক্ষায় রয়েছেন, তা সরকার প্রকাশ করে না। তবে মানবাধিকারকর্মীদের ধারণা, এই সংখ্যা শত শত হতে পারে।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচের মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা বিভাগের গবেষক জোই শিয়া বলেন, কোনো পূর্ব সতর্কতা বা স্বচ্ছতা ছাড়াই মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা বন্দী ও তাঁর পরিবারের মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত হওয়ার অধিকারও ক্ষুণ্ন করে।
বিবিসির সঙ্গে কথা বলা এক সৌদি কারাবন্দী জানান, ২০২৩ সালে মাদক পাচারের অভিযোগে গ্রেপ্তারের পর তিনি দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন। নিরাপত্তার কারণে তাঁর পরিচয় প্রকাশ করা হয়নি। তাঁর দাবি, চলতি বছর তিনি ১৫ জন সহবন্দীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হতে দেখেছেন। এখন প্রতিটি মুহূর্তেই নিজের মৃত্যুর আশঙ্কায় দিন কাটছে তাঁর।
তাঁর ভাষায়, কারাগারের দরজা খুললেই বন্দীরা ভাবতে থাকেন—‘এরপর কার পালা?’
মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হলেও অন্তত তাঁর মরদেহ যেন পরিবারের কাছে ফেরত পাঠানো হয়—এটাই এখন তাঁর শেষ ইচ্ছা।
‘আমি চিন্তায় থাকি যে আমার বাবা-মা হয়তো আমার মৃতদেহটাও দেখতে পারবেন না’—বিবিসিকে বলেন ওই বন্দী।