মালয়েশিয়া সফর শেষে চীনের দালিয়ানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান
মালয়েশিয়ায় দুই দিনের সফর শেষে চীনের দালিয়ানে পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। অংশ নেবেন সামার দাভোস ফোরামে, এরপর যাবেন বেইজিংয়ে।
সম্পাদকীয়: প্রযুক্তির চরম উৎকর্ষের এই যুগে চিরায়ত অপরাধের ধরন বদলে তা এখন প্রবেশ করেছে ডিজিটাল দুনিয়ায়। বিশেষ করে স্মার্টফোন ও সহজলভ্য ইন্টারনেটের অপব্যবহারের ফলে ‘অনলাইন জুয়া’ এখন দেশের তরুণ ও যুবসমাজের কাছে এক মরণব্যাধি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। এই বাস্তবতায় দেড়শ বছরেরও বেশি পুরোনো এবং বর্তমান প্রেক্ষাপটে সম্পূর্ণ অকার্যকর ‘দ্য পাবলিক গ্যাম্বলিং অ্যাক্ট ১৮৬৭’ রহিত করে সম্পূর্ণ নতুন ও যুগোপযোগী ‘জুয়া প্রতিরোধ’ আইন করতে জাতীয় সংসদে বিল আনা হয়েছে।
গতকাল মঙ্গলবার (২৩ জুন, ২০২৬) স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহ উদ্দিন আহমদ বিলটি সংসদে উত্থাপন করেন। বিলটি পরীক্ষা করে পরবর্তী পাঁচ কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য আইন মন্ত্রণালয়–সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে পাঠানো হয়েছে।
নতুন এই প্রস্তাবিত আইনে অনলাইন জুয়া, দূরবর্তী জুয়া, স্পোর্টস বেটিং, ক্রিপ্টোকারেন্সিভিত্তিক জুয়া, ম্যাচ ফিক্সিং বা স্পট ফিক্সিংসহ মোট ২৪ ধরনের অপরাধকে সুস্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত করে অপরাধের গভীরতা অনুযায়ী ১৪ ধরনের কঠোর সাজার বিধান রাখা হয়েছে—যা অত্যন্ত প্রশংসনীয় ও সময়োপযোগী একটি পদক্ষেপ।
নতুন এই বিলের উদ্দেশ্য ও কারণসংবলিত বিবৃতিতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যথার্থই উল্লেখ করেছেন যে, বর্তমান যুগে অনলাইন বেটিং প্ল্যাটফর্ম, ভিপিএন , সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ভুয়া মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস অ্যাকাউন্ট, বায়োমেট্রিক জালিয়াতি ও ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থার মাধ্যমে সংঘটিত জুয়া কেবল সমাজকে কলুষিত করছে না, বরং এর মাধ্যমে দেশ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদেশে পাচার হয়ে যাচ্ছে।
দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, জননিরাপত্তা ও নৈতিক ভারসাম্য রক্ষায় এই আইন পাস হওয়া এখন সময়ের দাবি। বিলে সাধারণ জুয়ার জন্য ২ বছরের কারাদণ্ড বা ২ লাখ টাকা জরিমানার বিধান থাকলেও অনলাইন জুয়ার জন্য ৫ বছরের কারাদণ্ড বা ১ কোটি টাকা অর্থদণ্ড এবং অনলাইন বেটিং ও ম্যাচ ফিক্সিংয়ের জন্য সর্বোচ্চ ৭ বছরের কারাদণ্ডসহ ৫ কোটি টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ডের যে কঠোর বিধান রাখা হয়েছে, তা অপরাধীদের মনে ভীতি সঞ্চার করতে সক্ষম হবে।
তবে শুধু কঠোর আইন প্রণয়ন করলেই যে অনলাইন জুয়ার মতো অদৃশ্য ও প্রযুক্তিনির্ভর অপরাধ পুরোপুরি নির্মূল করা সম্ভব নয়, তা অতীত অভিজ্ঞতা থেকে স্পষ্ট। অনলাইন জুয়া থেকে দেশের চালিকাশক্তি তথা যুবসমাজকে রক্ষা করতে রাষ্ট্র, সমাজ ও পরিবারকে সমন্বিতভাবে কিছু কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।
বিটিআরসি এবং সাইবার সিকিউরিটি এজেন্সিকে সার্বক্ষণিক তৎপর থাকতে হবে। বাংলাদেশে বসে যেসব আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় জুয়ার সাইট বা অ্যাপ চালানো হচ্ছে, সেগুলোর ডোমেন ও আইপি স্থায়ীভাবে ব্লক করতে হবে। একই সঙ্গে ভিপিএন ব্যবহার করে যাতে এগুলো সচল করা না যায়, তার জন্য শক্তিশালী ফায়ারওয়াল ও ডিপ প্যাকেট ইন্সপেকশন প্রযুক্তি ব্যবহার করা জরুরি।
অনলাইন জুয়ার মূল জ্বালানি হলো বিকাশ, রকেট, নগদের মতো মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস। জুয়ার সাইটগুলোতে ব্যবহৃত এজেন্ট বা মার্চেন্ট অ্যাকাউন্টগুলো দ্রুততম সময়ে শনাক্ত করে ব্লক করতে হবে। সন্দেহজনক বা অস্বাভাবিক লেনদেন ট্র্যাক করতে বাংলাদেশ ব্যাংকের ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটকে আরও সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে।
সন্তানরা মুঠোফোনে কী করছে, কোনো অস্বাভাবিক অ্যাপ ব্যবহার করছে কি না বা হঠাৎ বেশি অর্থ দাবি করছে কি না—সে বিষয়ে পিতামাতাকে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ধর্মীয় উপাসনালয়গুলোতে জুয়া ও বেটিংয়ের কুফল সম্পর্কে নিয়মিত প্রচারণা চালাতে হবে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ওটিটি প্ল্যাটফর্ম এবং বিভিন্ন লাইভ স্পোর্টস স্ট্রিমিং অ্যাপে বেটিং সাইটের প্রচ্ছন্ন ও প্রকাশ্য বিজ্ঞাপন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করতে হবে। অনেক সময় নামী ইনফ্লুয়েন্সার বা সেলিব্রিটিরা এসবের প্রমোশন করেন, তাদের বিরুদ্ধেও আইনি ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
রাষ্ট্রের সার্বিক নৈতিক অধঃপতন রোধ এবং তরুণ প্রজন্মকে এক অন্ধকার ভবিষ্যৎ থেকে টেনে তুলতে হলে এই আইনের কঠোর ও নিরপেক্ষ বাস্তবায়ন ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। আমরা আশা করি, স্থায়ী কমিটির পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে দ্রুতই বিলটি আইনে পরিণত হবে এবং মাঠপর্যায়ে এর যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করা হবে।
লেখক: রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান, বিশিষ্ট লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।