সম্পাদকীয় ডেস্ক: দেশের সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা পূরণ করে অবশেষে নতুন জাতীয় পে-স্কেলের খসড়া গেজেট তৈরির আনুষ্ঠানিক কাজ শুরু হয়েছে। সরকারের উচ্চপর্যায়ের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, নতুন এই বেতন কাঠামোর খসড়াটি প্রধানমন্ত্রীর চূড়ান্ত অনুমোদন সাপেক্ষে আগামী জুলাই মাসের মাঝামাঝি সময়ে গেজেট আকারে প্রকাশ হতে পারে।
প্রস্তাবিত এই নতুন পে-স্কেলে বিভিন্ন গ্রেডে সরকারি চাকরিজীবীদের মূল বেতন ১০০ থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর এক যুগান্তকারী সুপারিশ করা হয়েছে। মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনির নেতৃত্বাধীন উচ্চপর্যায়ের একটি বিশেষ কমিটি ইতিমধ্যে পে-কমিশনের মূল সুপারিশগুলো পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পর্যালোচনা করেছে এবং চূড়ান্ত বাস্তবায়নের এই রূপরেখাটি চলতি সপ্তাহেই অর্থ মন্ত্রণালয়ে জমা দেবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক মন্দা এবং অভ্যন্তরীণ বাজারে জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয়ের এই কঠিন সময়ে সরকারের এই উদ্যোগ সরকারি কর্মচারীদের পরিবারে বড় ধরনের স্বস্তি ফিরিয়ে আনবে।
অর্থনৈতিক বাস্তবতার নিরিখে নতুন পে-স্কেলের প্রস্তাবটি অত্যন্ত সুবিন্যস্ত এবং বৈষম্যহীন করার চেষ্টা করা হয়েছে। বেসামরিক প্রশাসন, বিচার বিভাগ এবং সশস্ত্র বাহিনীর জন্য গঠিত পৃথক তিনটি পে-কমিশনের মূল প্রতিবেদনগুলো নিবিড়ভাবে মূল্যায়ন করেই এই চূড়ান্ত সুপারিশমালা তৈরি করেছে মন্ত্রিপরিষদ সচিবের কমিটি।
সুপারিশের সবচেয়ে ইতিবাচক দিক হলো, নিম্ন বা মধ্যম সারির কর্মচারীদের আর্থিক সুরক্ষায় বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, প্রথম থেকে দশম গ্রেডের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের মূল বেতন ১০০ শতাংশ বা তার কিছুটা কম বাড়ার সম্ভাবনা থাকলেও, ১১তম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীদের মূল বেতন গড়ে প্রায় ১৩০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধির সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব করা হয়েছে।
মূল বেতনের এই শতভাগেরও বেশি প্রবৃদ্ধি এবং এর সাথে সামঞ্জস্য রেখে বিভিন্ন প্রাত্যহিক ভাতা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধির সুপারিশ নিম্ন বেতনভুক্ত কর্মচারীদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক মর্যাদা নিশ্চিত করতে সহায়ক হবে।
সরকার এই বিশাল আর্থিক সংশ্লেষের পে-স্কেলটি দুই ধাপে বাস্তবায়নের নীতিগত সিদ্ধান্তের দিকে এগোচ্ছে, যা দেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও বাজেট শৃঙ্খলার জন্য একটি দূরদর্শী পদক্ষেপ। তবে প্রথম ধাপেই সম্পূর্ণ নতুন মূল বেতন কার্যকর করার যে সুপারিশ রাখা হয়েছে, তা অত্যন্ত কার্যকর; কারণ মূল বেতন একবারে বৃদ্ধি না পেলে কর্মচারীরা বাজারের মূল্যস্ফীতির চাপ সরাসরি মোকাবিলা করতে সক্ষম হন না।
তবে মুদ্রাস্ফীতির এই বাজারে বেতন বৃদ্ধির এই ইতিবাচক সিদ্ধান্তের পাশাপাশি সরকারকে একটি বিষয়ে কঠোর সতর্কাবস্থা বজায় রাখতে হবে—নতুন পে-স্কেল ঘোষণার পরপরই দেশের বাজারে যেন নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম কৃত্রিম উপায়ে বাড়ানোর কোনো অপচেষ্টা না হয়।
অতীতে দেখা গেছে, সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়ার অজুহাতে অসাধু ব্যবসায়ীরা সাধারণ ভোক্তাদের পকেট কাটার খেলায় মেতে ওঠে, যা দেশের বিশাল বেসরকারী খাতের নিম্ন ও মধ্যবিত্ত নাগরিকদের ওপর অন্যায় চাপ সৃষ্টি করে।
পরিশেষে, আমরা মনে করি যে রাষ্ট্র যখন সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে মূল বেতন দ্বিগুণেরও বেশি বৃদ্ধির মতো একটি বড় আর্থিক দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিচ্ছে, তখন প্রশাসনের কাছ থেকেও কাজের শতভাগ স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও জনবান্ধব সেবা নিশ্চিত করার সময় এসেছে।
উচ্চ বেতনের এই নতুন প্রেষণা সরকারি দপ্তরে দুর্নীতি হ্রাস করতে এবং সাধারণ নাগরিকদের সেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দূর করতে প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করবে। অর্থ মন্ত্রণালয়ে রূপরেখা জমা পড়ার পর দ্রুততম প্রশাসনিক প্রক্রিয়া শেষে জুলাইয়ের নির্দিষ্ট সময়েই এই গেজেট প্রকাশিত হবে—এটাই আমাদের প্রত্যাশা।
লেখক: রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান, বিশিষ্ট লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।