সম্পাদকীয়

জুলাই বিপ্লবের দুই বছর: ছাত্র-জনতার আন্দোলন ও প্রত্যাশার হিসাব

কালের পরিক্রমায় দেখতে দেখতে দুটি বছর পেরিয়ে গেল। চব্বিশের সেই রক্তঝরা, গৌরবোজ্জ্বল ও অভূতপূর্ব ‘জুলাই বিপ্লবের’ স্মৃতিরোমন্থন করতে গিয়ে আজও আমার গা শিউরে ওঠে। ২০২৪ সালের মাঝামাঝি সময়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক অবক্ষয়ের চরম মুহূর্তে সংঘটিত সেই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও পরবর্তী গণ-অভ্যুত্থান ছিল মূলত দেশের সাধারণ শিক্ষার্থী এবং আপামর জনসাধারণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে পরিচালিত এক ঐতিহাসিক গণবিস্ফোরণ।

দুই বছর পর এসে পেছনে তাকালে চোখের সামনে যেমন ভেসে ওঠে স্বৈরাচার পতনের অনাবিল আনন্দ, তেমনি হৃদয়ে রক্তক্ষরণ ঘটায় অসংখ্য শহীদের আত্মত্যাগ আর বিপ্লব-পরবর্তী সাধারণ মানুষের অপূরণীয় প্রত্যাশার এক মিশ্র সমীকরণ।

দুই বছর পর সেই পটভূমির কথা মনে পড়ে, যখন ২০২৪ সালের মাঝামাঝি সময়ে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে এক তীব্র অস্থিরতা শুরু হয়েছিল। আর এই অস্থিরতার চূড়ান্ত সূত্রপাত ঘটেছিল ৫ জুন উচ্চ আদালত কর্তৃক বিতর্কিত কোটা পদ্ধতি পুনর্বহালের মধ্য দিয়ে। ভেতরে ভেতরে ফুঁসে উঠছিল দেশের তরুণ সমাজ। ১ জুলাই থেকে অরাজনৈতিক ছাত্র প্ল্যাটফর্ম ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’-এর ব্যানারে দেশের বিভিন্ন স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীরা কোটা সংস্কারের দাবিতে রাজপথে নেমে আসে।

প্রাথমিক অবস্থায় সম্পূর্ণ অহিংস ও শান্তিপূর্ণভাবে এই প্রতিবাদ কর্মসূচি পরিচালিত হলেও, তৎকালীন স্বৈরাচারী আওয়ামী লীগ সরকারের অনমনীয় ভাব ও উসকানিমূলক বক্তব্যের জেরে ১৫ জুলাই থেকে রাজপথ সহিংস রূপ ধারণ করে।

১৬ জুলাই থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত তৎকালীন শাসকগোষ্ঠী আন্দোলন দমনে পুলিশ, র‍্যাব এবং দলীয় ক্যাডার বাহিনীকে লেলিয়ে দিয়ে দেশজুড়ে এক নজিরবিহীন ও বর্বরোচারী হত্যাকাণ্ড চালায়। কিন্তু বুলেটের ভয় টেকেনি ছাত্র-জনতার অদম্য সাহসের কাছে।

নাহিদ ইসলাম, হাসনাত আব্দুল্লাহ, সারজিস আলম, আসিফ মাহমুদের মতো তরুণ শিক্ষার্থীদের দূরদর্শী নেতৃত্বে কোটা সংস্কারের আন্দোলন রূপ নেয় স্বৈরাচার পতনের একদফা দাবিতে। ৩৬ দিনের সেই অবরুদ্ধতা ও টানা আন্দোলনের পর অবশেষে ৫ আগস্ট ২০২৪ তথা শেখ হাসিনার পদত্যাগের ঐতিহাসিক মুহূর্তে লাখ লাখ আন্দোলনকর্মী প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও গণভবন অভিমুখে লং মার্চ করে। অবসান ঘটে দীর্ঘ ১৬ বছরের একচ্ছত্র ও নিপীড়নমূলক শাসনের। ৫ই জুন থেকে ৫ই অগাস্টের মধ্যে দেশে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ থেকে শুরু করে চূড়ান্ত দাঙ্গা পর্যন্ত মোট ৫৩৩টি বিক্ষোভের ঘটনা ঘটেছিল, যা স্বৈরাচারের ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছিল।

ইতিহাসের এই জুলাই আন্দোলনে আমি নিজে পুরো মাসজুড়ে ধানমন্ডি ২৭ নম্বরে শিক্ষার্থীদের সাথে সরাসরি রাজপথে অবস্থান করেছি ও মাঠপর্যায়ে নেতৃত্ব দিয়েছি। সেই দিনগুলো ছিল রক্ত আর বারুদের। নিজের তাগিদে, সম্পূর্ণ নিজ উদ্যোগে আন্দোলনরত ক্ষুধার্ত ও তৃষ্ণার্ত শিক্ষার্থীদের জন্য পানি, খাদ্য এবং জরুরি ঔষধের সরবরাহ নিশ্চিত করতে দিনরাত ছুটে চলেছি।

আমার জীবনের সবচেয়ে বেদনাবিধুর ও রক্তক্ষরণকারী ঘটনাটি ঘটেছিল ১৮ জুলাই, ২০২৪ তারিখে। কোটা সংস্কার আন্দোলন চলাকালে রাজধানীর ধানমন্ডিতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে পুলিশের নির্বিচার গুলির মুখে পড়ে ঢাকা রেসিডেন্সিয়াল মডেল কলেজের একাদশ শ্রেণির এক অকুতোভয় শিক্ষার্থী—ফারহান ফাইয়াজ। আমার চোখের সামনেই ফুটফুটে এই ছেলেটি রাবার বুলেটে নির্মমভাবে গুলিবিদ্ধ হয়।

বুক ঝাঁঝরা হয়ে যাওয়া রক্তাক্ত ফাইয়াজকে আমি নিজে ধরাধরি করে একটি রিকশায় তুলি এবং দ্রুত লালমাটিয়া সিটি হাসপাতালে নিয়ে যাই। কিন্তু চিকিৎসকদের সমস্ত চেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়ে সেখানে বেলা সাড়ে ৩টায় সে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। ফারহান ফাইয়াজের সেই রক্তাক্ত নিথর দেহ আর তার পরিবারের কান্না আজও আমাকে তাড়া করে ফেরে। এমন অগণিত প্রাণের বিসর্জনের মধ্য দিয়েই এই জুলাই বিপ্লব সফল হয়েছিল।

দুই বছর পর একটি প্রশ্ন খুব বড় হয়ে দেখা দিয়েছে—’জুলাই বিপ্লব: কে নেবে কৃতিত্ব, কে ছিলেন আসল নায়ক?’ সামাজিক ও রাজনৈতিক নানা মহলে এখন কৃতিত্বের ভাগাভাগি নিয়ে এক ধরনের নোংরা প্রতিযোগিতা আমরা লক্ষ্য করছি।

একজন রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও এই আন্দোলনের প্রত্যক্ষ অংশীদার হিসেবে আমি সবসময় একটি কথাই জোর দিয়ে বলে আসছি—এই ঐতিহাসিক জুলাই আন্দোলনে কোনো একটি নির্দিষ্ট দল বা ছাত্র সংগঠন একা আন্দোলন করেনি। এই আন্দোলন সফল হয়েছে দল-মত নির্বিশেষে সবার স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে।

আমাদের স্পষ্ট মনে রাখতে হবে, এই আন্দোলনে যুবদলের শহীদ হয়েছেন ৭৯ জন এবং ছাত্রদলের শহীদ হয়েছেন ১৪২ জন। এর বাইরে অন্যান্য রাজনৈতিক দল ও সাধারণ মেহনতি মানুষের আত্মত্যাগও কম নয়। তাই ইতিহাসের স্বার্থে যার যা অবদান আছে, তা তাকে দিতে হবে। কোনো একক গোষ্ঠীর পক্ষে এই বিশাল বিপ্লবকে কুক্ষিগত করার চেষ্টা মোটেও কাম্য নয়। আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বার্থে ‘সাদাকে সাদা এবং কালোকে কালো’ বলতে হবে।

ঐতিহাসিক জুলাই আন্দোলনের দুই বছর পর দেশের সাধারণ মানুষ যখন হিসাব মেলাতে বসে, তখন প্রশ্ন ওঠে—আমাদের প্রত্যাশা কতটা পূরণ হলো? স্বৈরাচারের পতন এবং বিতর্কিত কোটা পদ্ধতির সংস্কার আমরা করতে পেরেছি ঠিকই, কিন্তু যে ‘বৈষম্যহীন নতুন বাংলাদেশ’ এবং রাষ্ট্র সংস্কারের স্বপ্ন নিয়ে ফারহান ফাইয়াজরা বুক পেতে দিয়েছিল, তা এখনো পুরোপুরি অধরা। বাজার সিন্ডিকেট, অর্থনৈতিক সংকট, এবং মাঠপর্যায়ে কাঙ্ক্ষিত প্রশাসনিক সংস্কারের গতি এখনো ধীর।

শহীদদের রক্তের ঋণ শোধ করতে হলে আমাদের কৃতিত্বের রাজনীতি পরিহার করে একটি ন্যায্য ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র গঠনে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। রক্তস্নাত জুলাইয়ের দুই বছর পূর্তিতে এটাই হোক আমাদের শপথ।

লেখক: রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান, বিশিষ্ট লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।

Related News

নারীর নিরাপদ যাতায়াত ও আত্মনির্ভরশীলতা ‘পিংক বাস’ সার্ভিসের নতুন সম্ভাবনা ও টেকসই বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জ : রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান

বিআরটিসির নারী চালক চালিত পিংক বাস সার্ভিস, ঢাকা-চট্টগ্রাম-বগুড়ার রুট, নারীদের যাতায়াতের নিরাপত্তা ও অতীত ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে বিশেষ সম্পাদকীয়।

মূল্যস্ফীতির চ্যালেঞ্জ ও অর্থনৈতিক বাস্তবতার ভারসাম্য : রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান

সরকারি কর্মচারীদের ১০০% পর্যন্ত মূল বেতন বৃদ্ধির প্রস্তাবনা, নবম জাতীয় বেতন স্কেলের যৌক্তিকতা ও অর্থনৈতিক প্রভাব নিয়ে বিশেষ সম্পাদকীয়।

রাজনীতি, শিক্ষা ও সংগ্রামের বর্ণাঢ্য জীবন-অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী

বাংলাদেশের রাজনীতিতে সুপরিচিত ও আপসহীন ব্যক্তিত্ব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী। দীর্ঘ চার দশকেরও বেশি সময় ধরে সক্রিয় রাজনীতির মাঠে নানা প্রতিকূলতা, কারাবাস ও আন্দোলন-সংগ্রামের মধ্য…

প্রাথমিকে আধুনিক সংস্কার ও নতুন দিগন্ত গুণগত শিক্ষার প্রত্যয়ে সময়োপযোগী উদ্যোগ : রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান

প্রাথমিক শিক্ষার নতুন কারিকুলামে ইংরেজি স্পিকিং টেস্ট, ইউনিক আইডি ও গুণগত পরিবর্তনের পরিকল্পনা নিয়ে ববি হাজ্জাজের ঘোষণার আলোকে বিশেষ সম্পাদকীয়।

৩ লাখ রোহিঙ্গা ফেরানোর আশ্বাস ও রাখাইনের বাস্তবতা: কেবল প্রতিশ্রুতি নয়, চাই টেকসই প্রত্যাবাসন

মিয়ানমার জান্তা সরকারের ৩ লাখ রোহিঙ্গা ফেরত নেওয়ার ঘোষণা, রাখাইনের নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং টেকসই প্রত্যাবাসনের জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিয়ে বিশেষ সম্পাদকীয়।

বিদ্যুৎ-জ্বালানি খাতের সংকট ও টেকসই সমাধানের পথ : রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান

বিদ্যুৎমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুর বক্তব্য, দেশের বর্তমান বিদ্যুৎ সংকট, ক্যাপাসিটি চার্জ ও সমাধান নিয়ে বিশেষ সম্পাদকীয়।

পুলিশি ব্যবস্থায় অনাস্থা ও জেনজির আন্দোলন: দক্ষিণ এশিয়ার পুলিশ সংস্কারের তাগিদ

ঔপনিবেশিক দমনমূলক পুলিশি ব্যবস্থা ও দক্ষিণ এশিয়ায় জেন-জি আন্দোলনের প্রভাব নিয়ে সাবেক সিনিয়র উপপ্রধান মাহফুজুর রহমান সৈকতের বিশেষ কলাম।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফর দ্বিপক্ষীয় সংকট উত্তরণের ঐতিহাসিক সুযোগ : রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান

প্রধানমন্ত্রীর সম্ভাব্য ভারত সফর, ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কে সাম্প্রতিক টানাপোড়েন, শেখ হাসিনাকে ফেরানোর তাগিদ ও তিস্তা চুক্তিসহ দ্বিপক্ষীয় সমাধানের সম্ভাবনা নিয়ে বিশেষ সম্পাদকীয়।

Search