একটি রাজনৈতিক দল যখন দীর্ঘ লড়াই-সংগ্রামের পর জনগণের বিপুল ম্যান্ডেট নিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব লাভ করে, তখন তার মূল চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায় নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির দ্রুত ও দৃশ্যমান বাস্তবায়ন এবং একই সাথে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক বহুমুখী সমীকরণকে দক্ষতার সাথে মোকাবেলা করা।
চব্বিশের ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের স্পিরিটকে ধারণ করে ২০২৬ সালের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার পর, বর্তমান ক্ষমতাসীন দল বিএনপির নীতিনির্ধারণী গতিপ্রকৃতি কেমন হচ্ছে, তা দেশবাসীর জন্য অত্যন্ত কৌতূহলোদ্দীপক। গত শনিবার রাজধানীর গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে দলটির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম স্থায়ী কমিটির এক গুরুত্বপূর্ণ সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে এবং মালয়েশিয়া থেকে ভার্চুয়ালি যুক্ত হওয়া প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা মির্জা আব্বাসসহ স্থায়ী কমিটির প্রবীণ নেতাদের উপস্থিতিতে এই সভায় যেসকল সুনির্দিষ্ট এজেন্ডা ও সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে, তা বর্তমান সরকারের সুশাসন ও রাজনৈতিক দূরদর্শিতারই এক বলিষ্ঠ বহিঃপ্রকাশ।
গতকাল রোববার (১২ জুলাই, ২০২৬) এক প্রেস বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে দেশবাসীকে এই সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়, যা একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জবাবদিহিমূলক রাজনৈতিক সংস্কৃতির অনন্য উদাহরণ।
এই বৈঠকের সবচেয়ে ইতিবাচক দিকটি হলো সরকারের অগ্রাধিকারভিত্তিক সমাজকল্যাণমূলক ও কাঠামোগত প্রকল্পগুলোর ধারাবাহিক পর্যালোচনা। নির্বাচনের পর অনেক সময় দলগুলো ইশতেহারের কথা ভুলে গেলেও, স্থায়ী কমিটি নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়নে শতভাগ আশাবাদ ব্যক্ত করেছে।
বিশেষ করে তৃণমূলের প্রান্তিক মানুষের অর্থনৈতিক সুরক্ষায় ‘ফ্যামিলি কার্ড’, কৃষকদের অধিকার ও ভরতুকি নিশ্চিত করতে ‘কৃষক কার্ড’, কৃষির আধুনিকায়ন ও জলবায়ু টেকসইকরণের লক্ষ্যে দেশব্যাপী চলমান ‘খাল খনন কর্মসূচি’ এবং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের সেবকদের জন্য রাষ্ট্রীয় ভাতার প্রবর্তন—এই জনকল্যাণমুখী উদ্যোগগুলোর অগ্রগতিতে স্থায়ী কমিটির সন্তোষ প্রকাশ করা প্রমাণ করে যে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উন্নয়ন দর্শন সরাসরি সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছাতে শুরু করেছে।
তবে ২০২৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে একটি পুঙ্খানুপুঙ্খ পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন প্রস্তুতের দায়িত্ব স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খানকে দেওয়া এবং অতি দ্রুত জাতীয় কার্যকরী কমিটির সভা ডাকার সিদ্ধান্ত ইঙ্গিত করে যে, দলটি আত্মতুষ্টিতে না ভুগে নিজেদের সাংগঠনিক ভিতকে আরও সুসংহত ও স্বচ্ছ করতে সচেষ্ট।
অভ্যন্তরীণ রাজনীতির ময়দানে বিরোধী দলগুলোর (বিশেষ করে এনসিপি বা সমমনা জোট) উত্থাপিত ‘জুলাই সনদ’ এবং ‘গণভোট’ সংক্রান্ত প্রচারণাকে রাজনৈতিকভাবে মোকাবেলার যে কৌশল স্থায়ী কমিটি নিয়েছে, তা বেশ অর্থবহ।
বিরোধী শিবিরের এই তৎপরতাকে ‘জনগণকে বিভ্রান্ত করার প্রচেষ্টা’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে এর কাউন্টার-ন্যারেটিভ হিসেবে বিএনপির মূল অবস্থান ও নতুন বাংলাদেশের সংস্কার রূপরেখা জনগণের কাছে আরও স্পষ্টভাবে তুলে ধরতে দলীয় প্রচার ও স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রাক্কালে মাঠপর্যায়ের ইউনিটগুলোকে শক্তিশালী করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এটি প্রমাণ করে, নতুন বাংলাদেশে যেকোনো রাজনৈতিক বিতর্ককে পেশীশক্তি দিয়ে নয়, বরং আদর্শিক ও সাংগঠনিক তৎপরতা দিয়ে রাজপথে ও ব্যালটে মোকাবেলা করতে চায় বর্তমান শাসক দল।
কূটনৈতিক ফ্রন্টের আলোচনা ও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি মূল্যায়নে স্থায়ী কমিটির দূরদর্শী দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় মেলে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক চীন ও মালয়েশিয়া সফরকে অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব জোরদারের ক্ষেত্রে যে ঐতিহাসিক ও ইতিবাচক মাইলফলক হিসেবে মূল্যায়ন করা হয়েছে, তা শতভাগ বাস্তবসম্মত। বিশেষ করে পরাশক্তি চীনের সাথে কৌশলগত ও মালয়েশিয়ার সাথে দ্বিপাক্ষিক জনশক্তি ও বাণিজ্য সম্পর্ক নতুন বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পুনর্গঠনে বড় চালিকাশক্তি হবে।
এর পাশাপাশি বাংলাদেশের ইতিহাসে এক বিশাল গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায় যুক্ত হয়েছে দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভাপতি নির্বাচিত হওয়ায়। বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের এই অনন্য অর্জনকে স্থায়ী কমিটি যেভাবে রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানের মোক্ষম হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের ওপর জোর দিয়েছে, তা আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে দেশের মর্যাদাকে আরও এক ধাপ বাড়িয়ে দেবে।
তবে কেবল সাফল্যই নয়, বিশ্ব ও অভ্যন্তরীণ সংকটের বিষয়েও স্থায়ী কমিটি সমানভাবে সোচ্চার ও উদ্বিগ্ন। মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে পুনরায় সংঘর্ষ শুরু হওয়ায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা ও জ্বালানি সংকটের বিষয়ে যে সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে, তা অত্যন্ত সময়োপযোগী।
বিশ্বনেতৃত্বের প্রতি আলোচনার মাধ্যমে শান্তিপূর্ণ সমাধানের এই আহ্বান বাংলাদেশের শান্তিকামী পররাষ্ট্রনীতিরই প্রতিফলন। একই সাথে, দেশের তরুণ সমাজকে গ্রাস করতে থাকা মাদক সমস্যার বিস্তার নিয়ে স্থায়ী কমিটির উদ্বেগ এবং এর বিরুদ্ধে আরও কঠোর ও কার্যকর প্রশাসনিক পদক্ষেপ গ্রহণের তাগিদ প্রমাণ করে যে, সামাজিক ব্যাধি দূরীকরণে সরকার কোনো আপস করবে না।
পরিশেষে বলা যায়, গুলশানের এই উচ্চপর্যায়ের নীতিনির্ধারণী সভাটি কেবল বিএনপির দলীয় কর্মকাণ্ডকে সক্রিয় করার গাইডলাইন নয়; বরং এটি দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার এক রাষ্ট্রীয় ইশতেহার।
অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনসহ সব ইউনিটকে তৃণমূল পর্যন্ত সক্রিয় রাখার যে নির্দেশ প্রধানমন্ত্রী দিয়েছেন, তা যদি আমলাতান্ত্রিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতার মোহে পথ না হারায়, তবে বর্তমান নির্বাচিত সরকারের হাত ধরে বাংলাদেশ একটি স্বনির্ভর, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও গৌরবময় নতুন সূর্যোদয়ের দিকে এগিয়ে যাবে—এটাই আমাদের দৃঢ় প্রত্যাশা।
লেখক: রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান, বিশিষ্ট লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।