সম্পাদকীয় প্রতিবেদন : রাজধানী ঢাকায় দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত সমস্যাগুলোর অন্যতম হলো যানজট এবং তদুপরি তথাকথিত ‘ভিআইপি কালচার’ বা হাই-প্রোফাইল প্রটোকল সংস্কৃতি। এই প্রটোকলের কারণে সাধারণ মানুষকে প্রতিনিয়ত যে সীমাহীন ভোগান্তির মুখোমুখি হতে হতো, তা নিরসনে সরকার একটি যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে।
শপথের পর থেকে পুলিশ প্রহরায় চলাফেরা করা ১৮ জন মন্ত্রীর বহর থেকে এসকর্ট (পুলিশের বিশেষ পাহারা দল) গাড়ি সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্তটি জাতীয় রাজনীতি ও নাগরিক ব্যবস্থাপনায় অত্যন্ত ইতিবাচক পরিবর্তনের বার্তা প্রদান করে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) যৌথ উদ্যোগে গৃহীত এই সিদ্ধান্ত কেবল জ্বালানি সাশ্রয় বা অপচয় রোধে ভূমিকা রাখবে না, বরং রাজধানীবাসীর দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় এক বড় ধরনের মানসিক ও ব্যবহারিক স্বস্তি এনে দেবে।
প্রধানমন্ত্রীর স্বীয় প্রটোকল কমানোর উদাহরণ অনুসরণে সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে এই সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হয়েছে। বর্তমানে কেবল অত্যন্ত সংবেদনশীল ও নিরাপত্তা ঝুঁকিতে থাকা ৬ জন মন্ত্রী এবং ১ জন উপদেষ্টাকে এই এসকর্ট সুবিধা বহাল রাখা হয়েছে। বাকি ১৮ জন মন্ত্রীর প্রটোকল প্রত্যাহারের ফলে প্রায় ৯০ জন নিবেদিত পুলিশ সদস্য দায়িত্ব মুক্ত হয়েছেন এবং প্রটোকল বহরের গাড়ির সংখ্যা ২৫টি থেকে ৭টিতে নেমে এসেছে। এই সিদ্ধান্তের ফলে নাগরিক জীবনে এর প্রভাব ও বহুমুখী সুবিধা-অসুবিধা বিশদভাবে পর্যালোচনার দাবি রাখে।
ভিআইপি বহর চলাচলের সময় রাজপথের গুরুত্বপূর্ণ সিগন্যালগুলো দীর্ঘক্ষণ বন্ধ রেখে সাধারণ যানবাহনের গতি রোধ করা হতো। প্রটোকল কমানোর ফলে সড়কে কৃত্রিম যানজটের সূচনা অনেকটাই কমে যাবে, যা সাধারণ যাত্রী, জরুরি রোগী, স্কুলগামী শিক্ষার্থী ও কর্মজীবী মানুষের অমূল্য সময় বাঁচাবে।
ভিআইপি সুরক্ষায় নিয়োজিত ৯০ জনের মতো প্রশিক্ষিত পুলিশ সদস্য ও তাদের যানবাহন এখন ডিএমপির মূল আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, অপরাধ দমন ও শহরের নিয়মিত টহলে ব্যবহার করা যাবে। এতে নগরবাসীর সার্বিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও সুদৃঢ় হবে।
সরকারি বহরের অতিরিক্ত গাড়ি ও জ্বালানি ব্যয় কমানোর মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় কোষাগারের অর্থ সাশ্রয় হবে, যা পরোক্ষভাবে জনগণের ওপর করের চাপ কমাতে কিংবা উন্নয়নমূলক কাজে ব্যবহার হতে পারে।
সাধারণ মানুষের মতোই জনপ্রতিনিধিরা যখন ট্রাফিকের মধ্যে রাজপথে চলাচল করেন, তখন আমলাতান্ত্রিক দূরত্ব হ্রাস পায়। এতে সাধারণ নাগরিকের মনে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার ওপর আস্থা বৃদ্ধি পায় এবং ‘ভিআইপি বনাম সাধারণ নাগরিক’ ব্যবধান কমে আসে।
কোনো ধরনের বিশেষ এসকর্ট বা ট্রাফিক অগ্রাধিকার না থাকায় সাধারণ যানজটে আটকা পড়ে মন্ত্রী বা উচ্চপদস্থ নীতি-নির্ধারকদের জরুরি সরকারি বৈঠক, কূটনৈতিক সাক্ষাৎ বা প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনে সময়মতো পৌঁছানো কিছুটা ব্যাহত হতে পারে।
যদিও প্রটোকল কমানোর সিদ্ধান্তটি সমন্বিত নিরাপত্তার ভিত্তিতেই নেওয়া হয়েছে, তবুও হঠাৎ কোনো রাজনৈতিক বা আইনশৃঙ্খলাজনিত ঝুঁকি দেখা দিলে তাৎক্ষণিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা চ্যালেঞ্জিং হতে পারে।
সাধারণ মানুষের ভোগান্তি কমিয়ে রাষ্ট্রীয় সম্পদ বাঁচানো এবং সুরক্ষা বাহিনীর মূল কাজকে অগ্রাধিকার দেওয়ার লক্ষ্যে এই সিদ্ধান্তটি অত্যন্ত প্রশংসনীয় ও সময়োপযোগী। ভিআইপিদের জন্য অতিরিক্ত বিশেষ সুবিধা না দিয়ে সাধারণ ট্রাফিক নিয়মের অধীনে সবাইকে সামিল করা এক কল্যাণকামী রাষ্ট্রের শুভ লক্ষণ। প্রটোকল নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি কার্যকর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গেলে নাগরিক জীবনে প্রকৃত স্বস্তি ফিরে আসবে।
লেখক: রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান, বিশিষ্ট লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।