সম্পাদকীয়

নতুন এটিসি টাওয়ার ও আধুনিক রাডার: আকাশসীমার নিরাপত্তা ও জাতীয় রাজস্বে এক নবদিগন্ত

সম্পাদকীয় প্রতিবেদন: বাংলাদেশের আকাশপথ ও বিমান চলাচল ইতিহাসে এক স্বর্ণোজ্জ্বল মাইলফলক উন্মোচিত হয়েছে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নতুন এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল (এটিসি) টাওয়ার ও অত্যাধুনিক রাডার সিস্টেম চালুর মাধ্যমে। জি-টু-জি ভিত্তিতে ফ্রান্সের ‘থ্যালেস’ কোম্পানির প্রযুক্তিতে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) অর্থায়নে নির্মিত এই আধুনিক এটিএম-সিএনএস প্রযুক্তি কেবল যে দেশের আকাশসীমার নিরাপত্তাকে সুসংহত করেছে তা নয়, বরং জাতীয় অর্থনীতিতে রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রেও তৈরি করেছে এক অভূতপূর্ব গতিশীলতা।

সিএএবি-এর প্রায় ৯৪২ কোটি টাকা ব্যয়ে বাস্তবায়িত এই প্রকল্প প্রমাণ করেছে যে, আধুনিক প্রযুক্তিগত বিনিয়োগ কীভাবে একটি রাষ্ট্রীয় খাতকে যুগপৎ নিরাপদ ও লাভজনক করে তুলতে পারে।

বিগত দিনগুলোতে পুরোনো ও সীমিত সক্ষমতার নেভিগেশন ব্যবস্থার কারণে বঙ্গোপসাগর সংলগ্ন আকাশসীমার একটি বড় অংশ কার্যকর নজরদারির বাইরে থেকে যেত। ফলে বাংলাদেশের আকাশসীমা ব্যবহার করেও আন্তর্জাতিক নিয়মানুযায়ী নির্ধারিত ‘ফ্লাইং ওভার চার্জ’ আদায় করা সম্ভব হতো না। নতুন প্রযুক্তিতে যুক্ত হওয়া ৮০ নটিক্যাল মাইল সক্ষমতার এস-ব্যান্ড প্রাইমারি রাডার এবং ২০০ নটিক্যাল মাইল কভারেজ সম্পন্ন মোড-এস সেকেন্ডারি সার্ভেল্যান্স রাডার চালু হওয়ায় এখন দেশের পুরো আকাশপথ সার্বক্ষণিক নিবিড় পর্যবেক্ষণের আওতায় এসেছে।

এই আধুনিকায়নের প্রত্যক্ষ সুফল মিলছে জাতীয় রাজস্বে। পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ফ্লাইং ওভার চার্জ বাবদ আদায়কৃত রাজস্বে এক দুর্দান্ত ঊর্ধ্বমুখী প্রবৃদ্ধি এসেছে। ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে যেখানে আয় ছিল ৫৩ কোটি ৫৯ লাখ টাকা, ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে তা বেড়ে ৮০ কোটি ১৬ লাখ টাকা অতিক্রম করেছে। অর্থাৎ জানুয়ারি মাসের তুলনাতেই অতিরিক্ত আয় এসেছে ২৬ কোটি ৫৭ লাখ টাকার বেশি।

২০২৪ সালের প্রথম তিন মাসে (জানুয়ারি-মার্চ) মোট আয় ছিল ১৫৭ কোটি ১৫ লাখ টাকা। ২০২৫ সালের একই সময়ে তা বেড়ে ১৮৪ কোটি ৫৩ লাখ টাকা এবং ২০২৬ সালের প্রথম তিন মাসে এই আয় রেকর্ড ১৯৯ কোটি ২৮ লাখ টাকা স্পর্শ করেছে।

বিগত দুই বছরের ব্যবধানে ফেব্রুয়ারিতে রাজস্ব আয় প্রায় ২২ কোটি টাকা বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৬৯ কোটি ৫৮ লাখ টাকায়। একইভাবে মার্চ ২০২৬-এ আয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬২ কোটি ১৭ লাখ টাকায়।

রাজস্ব আয়ের এই চমকপ্রদ পরিসংখ্যানের পাশাপাশি রাডার ব্যবস্থার ফলে এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলাররা এখন ‘রিয়েল-টাইম’ তথ্য পাচ্ছেন, যা দ্রুত ও নির্ভুল সিদ্ধান্ত গ্রহণে সাহায্য করছে এবং ফ্লাইট পরিচালনাকে করছে অত্যন্ত সুশৃঙ্খল ও নিরাপদ। কোনো উড়োজাহাজই আর রাডারের নজরদারি এড়িয়ে যেতে পারছে না, যা সার্বভৌম আকাশসীমার সুরক্ষায় এক বিশাল অর্জন।

পরিশেষে বলা যায়, আন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান চলাচল সংস্থার মানদণ্ড নিশ্চিত করে বাস্তবায়িত এই প্রকল্প আমাদের এভিয়েশন খাতকে বৈশ্বিক উচ্চতায় উন্নীত করেছে। অবকাঠামোগত ও প্রযুক্তিগত এ সাফল্য কেবল আর্থিক মুনাফাতেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং বৈশ্বিক আকাশপথে বাংলাদেশের বিশ্বাসযোগ্যতা ও সম্মান বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। এই ধারা বজায় রেখে দেশের অন্যান্য আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরগুলোর কারিগরি সক্ষমতাও পর্যায়ক্রমে বৃদ্ধি করা হবে—এটাই প্রত্যাশা।

লেখক: রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান, বিশিষ্ট কলামিস্ট, রাজনীতিবিদ ও রাস্ট্রচিন্তক।

Related News

আঞ্চলিক জ্বালানি সহযোগিতা ও মিয়ানমার থেকে পাইপলাইনে গ্যাস আমদানি : একটি কৌশলগত সমাধান

জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় মিয়ানমার থেকে পাইপলাইনে গ্যাস আমদানির সরকারের প্রস্তাব, এর বাস্তবায়ন কৌশল এবং দেশের দীর্ঘমেয়াদী গ্যাস সংকট নিরসনে করণীয় নিয়ে বিশেষ সম্পাদকীয়।

সরকার-ব্যবসায়ী যৌথ অংশীদারিত্ব: পাঁচ বছরে অর্থনৈতিক পুনর্জাগরণের বাস্তবসম্মত রোডম্যাপ

বিডার মতবিনিময় সভায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বক্তব্য, আগামী ৫ বছরে অর্থনৈতিক অগ্রগতি নিশ্চিতকরণ এবং ১০০ বিলিয়ন ডলার রপ্তানি লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিয়ে বিশেষ সম্পাদকীয়।

রোহিঙ্গা সংকট ও যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক উপস্থিতি: প্রত্যাবাসনের টেকসই রোডম্যাপ প্রণয়নের এটাই উপযুক্ত সময়

মার্কিন বিশেষ দূত সার্জিও গোরের কক্সবাজার রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শনের প্রেক্ষিতে রোহিঙ্গাদের নিজ দেশ মিয়ানমারে টেকসই ও নিরাপদ প্রত্যাবাসনের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিয়ে সম্পাদকীয় প্রতিবেদন।

মাঠপর্যায়ে প্রধানমন্ত্রীর আকস্মিক পরিদর্শন: জনবান্ধব নগর ব্যবস্থাপনা ও জবাবদিহিতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত

ডিএনসিসি প্রশাসককে সঙ্গে নিয়ে গভীর রাতে প্রধানমন্ত্রীর নিজে গাড়ি চালিয়ে রাজধানীর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও সড়ক পরিদর্শনের প্রশংসনীয় উদ্যোগ নিয়ে বিশেষ সম্পাদকীয়।

নিত্যপণ্যে অদৃশ্য বিষ, মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণ, জনস্বাস্থ্য ঝুঁকি ও আমাদের করণীয় : রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান

বাংলাদেশের সয়াবিন তেল, চিনি ও টুথপেস্টে বিষাক্ত মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণ, জনস্বাস্থ্যে এর ক্ষতিকর প্রভাব এবং তা থেকে আত্মরক্ষার করণীয় নিয়ে বিস্তারিত সম্পাদকীয় প্রতিবেদন।

সাময়িক সংকট ও দীর্ঘমেয়াদী জ্বালানি নিরাপত্তা, মালয়েশিয়ার সহায়তা এবং আমাদের করণীয় : রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান

এফএসআরইউ বিকল হওয়ায় দেশে সৃষ্টি হওয়া গ্যাস সংকট, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কূটনৈতিক উদ্যোগ এবং সংকট উত্তরণে করণীয় পদক্ষেপ নিয়ে বিশেষ সম্পাদকীয়।

রাষ্ট্রপতি নিয়োগের যোগ্যতা ও বৈশ্বিক গুরুত্ব : রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান

যোগ্যতার ভিত্তিতে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন, সাংবিধানিক প্রজ্ঞা, বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশকে সফলভাবে তুলে ধরতে দক্ষ রাষ্ট্রপতির গুরুত্ব নিয়ে বিশেষ সম্পাদকীয় নিবন্ধ।

ভিআইপি সংস্কৃতির ইতি ও সাধারণের স্বস্তি, ১৮ মন্ত্রীর এসকর্ট প্রত্যাহারের ইতিবাচক বার্তা : রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান

সরকারের ১৮ জন মন্ত্রীর ভিআইপি প্রটোকল ও পুলিশের এসকর্ট গাড়ি প্রত্যাহারের ফলে ঢাকার ট্রাফিক, পুলিশিং ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় সৃষ্ট সুবিধা ও চ্যালেঞ্জ নিয়ে বিশেষ সম্পাদকীয়।

Search