একটি সভ্য, আধুনিক ও সুশাসিত সমাজের প্রধান মাপকাঠি হলো নারী ও শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। কিন্তু সাম্প্রতিককালে প্রকাশিত বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের আগস্ট মাসের নির্যাতন সংক্রান্ত পরিসংখ্যান চিত্রটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক ও হৃদয়বিদারক। মাত্র এক মাসে ২৫২ জন নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতনের শিকার হওয়া এবং প্রতিদিন গড়ে আটজন নারী ও শিশুর ওপর এই নিষ্ঠুরতার ঘটনা আমাদের সামাজিক নৈতিকতা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার এক গভীর ক্ষতকে প্রকাশ করে।
৫৫টি হত্যাকাণ্ড এবং ৫৪টি ধর্ষণের মতো অপরাধ প্রমাণ করে যে নারী ও শিশুদের সুরক্ষায় আমাদের এখনো অনেক দীর্ঘ পথ অতিক্রম করতে হবে।
যেকোনো বিচারহীনতার সংস্কৃতি অথবা আইনি প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা অপরাধীদের আরও দুঃসাহসী করে তোলে। তাই এ ধরনের নির্যাতনকে কেবল বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে না দেখে একটি জরুরি সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় সংকটের রূপ হিসেবে দেখা উচিত।
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের লিগ্যাল এইড উপপরিষদ কর্তৃক দেশের ১৫টি জাতীয় দৈনিক এবং ২টি অনলাইন সংবাদপত্রের তথ্যের ভিত্তিতে সংকলিত এই প্রতিবেদনটিতে নির্যাতনের যে বহুমুখী রূপ উঠে এসেছে, তা অত্যন্ত ভয়াবহ।
আগস্ট মাসে ৩৬ জন কন্যা শিশুসহ মোট ৫৪ জন ধর্ষণের শিকার হয়েছে, যার মধ্যে দলবদ্ধ ধর্ষণ ও ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনাও রয়েছে। একই সাথে সাইবার সহিংসতা, যৌন নিপীড়ন ও উত্ত্যক্তকরণের ঘটনা প্রতিনিয়ত বৃদ্ধি পাচ্ছে।
শুধু প্রকাশ্য স্থানেই নয়, গৃহকর্মী নির্যাতন, পারিবারিক সহিংসতা, অগ্নিদগ্ধ করা এবং বাল্যবিবাহের মাধ্যমে নিজ বাসস্থানেও নারী ও শিশুরা সুরক্ষিত থাকতে পারছে না।
নারী ও শিশুদের বিরুদ্ধে সহিংসতা শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনতে কেবল উদ্বেগ প্রকাশ বা আইন প্রণয়নই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন সমন্বিত ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন মামলাগুলো দ্রুততম সময়ে নিষ্পত্তি করতে হবে। অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা গেলে অপরাধ সংঘটনের প্রবণতা অনেকটাই হ্রাস পাবে।
পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে সমাজের সর্বস্তরে নারী প্রতি শ্রদ্ধা ও সমতার মানসিকতা গড়ে তুলতে হবে। ভুক্তভোগীদের জন্য দ্রুত চিকিৎসা, আইনি ও মানসিকভাবে সহায়তার পাশাপাশি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে সাইবার অপরাধ দমনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিশেষ নজরদারি জরুরি।
নারী ও কন্যাশিশুদের সুরক্ষা দেওয়া কেবল সরকারের একার দায় নয়; এটি আমাদের পুরো সমাজের নৈতিক দায়িত্ব। প্রতিটি নাগরিককে নিজ নিজ জায়গা থেকে সহিংসতার বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে হবে। অপরাধী যেই হোক না কেন, রাজনৈতিক বা সামাজিক প্রভাবের ঊর্ধ্বে উঠে তার শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
একটি নিরাপদ, মানবিক ও বৈষম্যহীন সমাজ গঠন করতে হলে আমাদের কন্যা ও নারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কোনো বিকল্প নেই।
লেখক: রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান, বিশিষ্ট কলামিস্ট, রাজনীতিবিদ ও রাষ্ট্রচিন্তক।