‘ধ্বংসপ্রাপ্ত অর্থনীতি’ তত্ত্ব ও বাস্তবতার খতিয়ান
বর্তমান সরকারের অর্থ উপদেষ্টার ‘ধ্বংসপ্রাপ্ত অর্থনীতি’ দাবির যৌক্তিকতা নিয়ে অর্থনীতিবিদ ড. বিরূপাক্ষ পালের বিশদ বিশ্লেষণ ও মতামত।
অর্থনীতি: জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ যে আশঙ্কাজনক পতন দেখেছিল, তা সফলভাবে ঠেকানো গেছে। বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় রিজার্ভ বেশ সুসংহত ও স্বস্তিজনক পর্যায়ে রয়েছে, যা দেশের জন্য একটি বড় স্বস্তির বিষয়। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেল, গ্যাস, সারসহ নিত্যপণ্যের দাম চড়া থাকা সত্ত্বেও পর্যাপ্ত রিজার্ভ থাকায় আমরা সেই উচ্চমূল্যেই প্রয়োজনীয় আমদানি খরচ অনায়াসে মেটাতে পারছি।
আওয়ামী লীগ আমলের শেষ দিকে প্রকৃত রিজার্ভ যখন ২০ বিলিয়ন ডলারের নিচে নেমে গিয়েছিল, তখন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের বেশ কিছু সময়োপযোগী উদ্যোগ রিজার্ভের পতন রোধ করে। বর্তমান সরকারের সময়েও প্রবাসী আয় ও রপ্তানি আয়ের ধারা অব্যাহত থাকায় বৈদেশিক মুদ্রার মজুত বেড়ে বর্তমানে ৩৬ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। এ নিয়ে দ্বিমতের কোনো অবকাশ নেই যে, বহির্বিশ্বের সঙ্গে দেনা পরিশোধ ও জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতের ক্ষেত্রে এই স্বস্তি অত্যন্ত জরুরি ছিল।
তবে রিজার্ভের এই স্বস্তিদায়ক চিত্রের পেছনে কিছু গভীর চিন্তার কারণও রয়েছে। দেশের অর্থনীতিতে এখন সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হলো বিনিয়োগ স্থবিরতা। বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তারা পর্যাপ্ত ঋণ পাচ্ছেন না। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে রপ্তানিমুখী শিল্পকারখানায় তীব্র গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকট।
শিল্পে জ্বালানির এই সংকট অবিলম্বে দূর করতে হবে। গ্যাস-বিদ্যুতের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ না থাকলে রপ্তানিমুখী শিল্পে নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণ করা অসম্ভব হয়ে দাঁড়াবে। পাশাপাশি বর্তমান কারখানাগুলোতেও উৎপাদন ব্যাহত হতে পারে। শেষ পর্যন্ত যদি রপ্তানি আয় কমে যায় এবং বিদেশ থেকে পর্যাপ্ত ডলারের জোগান না আসে, তবে বর্তমান রিজার্ভ দীর্ঘস্থায়ী করা কঠিন হবে। কারণ জ্বালানি তেল, গ্যাস ও সার আমদানির জন্য নিয়মিত বড় অংকের ডলারের প্রয়োজন হয়।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো মুদ্রাবাজারের ব্যবস্থাপনা। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার বাজারমুখী করা হয়েছিল, যার ফলে বিনিময় হার স্বাভাবিকভাবে স্থিতিশীল ছিল। কিন্তু বর্তমান সময়ে আবারও বিনিময় হার একরকম ‘ফিক্সড’ বা নির্দিষ্ট করে দেওয়া এবং বেচাকেনার সীমা বেঁধে দেওয়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। কৃত্রিম উপায়ে বৈদেশিক মুদ্রাবাজার নিয়ন্ত্রণ করার এই পুরোনো কৌশল বর্জন করে বাজারের ওপর ছেড়ে দেওয়া উচিত।
পরিশেষে বলা যায়, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধি নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। তবে একই সঙ্গে অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি, গ্যাস-বিদ্যুতের সংকট নিরসন এবং বাজারভিত্তিক মুদ্রানীতি বজায় না রাখলে দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির প্রকৃত গতিশীলতা রক্ষা করা কঠিন হবে। রিজার্ভ ধরে রাখার পাশাপাশি উৎপাদনমুখী অর্থনীতিকে চাঙ্গা করার দিকেই এখন সর্বোচ্চ নজর দেওয়া উচিত।