রিজার্ভের স্বস্তির আড়ালে বিনিয়োগ ও বৈদেশিক বাণিজ্যের চ্যালেঞ্জ
বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়লেও দেশের বিনিয়োগ স্থবিরতা, গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট এবং মুদ্রাবাজার নিয়ন্ত্রণের প্রবণতা অর্থনীতিতে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।
অর্থনীতি ডেস্ক: গত দুই বছরে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার বৈদেশিক মুদ্রার মজুত বা রিজার্ভ পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে প্রায় চার মাসের আমদানি ব্যয় মেটানোর মতো পর্যাপ্ত রিজার্ভ রয়েছে, যেখানে সাধারণত তিন মাসের মজুত থাকলেই তা গ্রহণযোগ্য হিসেবে ধরা হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, গত রোববার রিজার্ভের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩৬ দশমিক ৩৯ বিলিয়ন (৩ হাজার ৬৩৯ কোটি) ডলারে। বিগত ছয় মাসে রিজার্ভ বেড়েছে প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) শর্ত অনুযায়ী বিপিএম ৬ (ব্যালান্স অব পেমেন্ট অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল ইনভেস্টমেন্ট পজিশন) ম্যানুয়ালের প্রকৃত রিজার্ভের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩১ বিলিয়ন ডলারের বেশি (৩ হাজার ৪৭৪ কোটি)। গত সপ্তাহে রিজার্ভ সাড়ে ৩৭ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেলেও ১ দশমিক ৩৯ বিলিয়ন ডলারের বৈদেশিক ঋণ ও আমদানি বিল পরিশোধের কারণে তা সামান্য কমেছে।
রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও পরবর্তীতে দায়িত্ব নেওয়া সরকারগুলোর সময়ে এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের সময়োপযোগী পদক্ষেপে বাজারভিত্তিক ডলারের দাম নির্ধারণের ফলে প্রবাসী আয়ে (রেমিট্যান্স) বড় ধরনের উল্লম্ফন দেখা গেছে। গত ডিসেম্বর থেকে মে মাস পর্যন্ত টানা ছয় মাস তিন বিলিয়ন ডলারের বেশি রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন প্রবাসীরা। পাশাপাশি রপ্তানি আয়েও প্রবৃদ্ধি বজায় থাকায় রিজার্ভের এই ঊর্ধ্বমুখী ধারা অব্যাহত রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তীব্র ডলার-সংকট ও অব্যবস্থাপনার কারণে ৮৬ টাকার ডলার ১২৮ টাকায় উঠেছিল এবং রিজার্ভ আশঙ্কাজনকভাবে কমে গিয়েছিল। তবে অন্তর্বর্তী সরকার ও পরবর্তী সময়ে বর্তমান সরকারের দায়িত্ব নেওয়ার পর সঠিক নীতি এবং ডলারের বাজার স্থিতিশীল রাখার ফলে গত ১৮ মাসে রিজার্ভে প্রায় ৯ বিলিয়ন ডলার যুক্ত হয়েছে।
রিজার্ভ বাড়ায় মধ্যপ্রাচ্য সংকট ও বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেল, এলএনজি ও সারের দাম বাড়লেও অতিরিক্ত আমদানি খরচ অনায়াসে সামাল দেওয়া যাচ্ছে। ব্যাংকগুলোতে ডলারের বিনিময় হার ১২৩–১২৪ টাকার মধ্যে স্থিতিশীল রয়েছে। তবে রিজার্ভ বৃদ্ধির এই স্বস্তির আড়ালে অর্থনীতির কিছু অভ্যন্তরীণ দুর্বলতাও ফুটে উঠেছে।
বেসরকারি খাতে বিনিয়োগে স্থবিরতা থাকায় শিল্পের মূলধনি যন্ত্রপাতি এবং কাঁচামাল আমদানি কিছুটা কমেছে। ফলে চাহিদার তুলনায় ডলারের ব্যবহার কম হওয়ায় রিজার্ভ স্ফীত হচ্ছে, যা সামগ্রিক অর্থনীতিকে পুরোপুরি চাঙা হওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে না। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান মনে করেন, ভবিষ্যতে আমদানির চাহিদা বাড়লে এবং ২০২৯ সাল নাগাদ প্রায় ৭ বিলিয়ন ডলারের বিদেশি ঋণ পরিশোধের চাপ সামলাতে সুনির্দিষ্ট কৌশল অবলম্বন করতে হবে।
রিজার্ভ নিরাপদ রাখতে বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখা, বিদেশি ঋণ পরিশোধের চাপ মোকাবিলা এবং বিনিয়োগ বৃদ্ধির পাশাপাশি যেকোনো বৈশ্বিক সংকটে আমদানি সক্ষমতা ধরে রাখার ওপর বিশেষ জোর দেওয়ার তাগিদ দিয়েছেন অর্থনীতিবিদরা।