বিগত দুই বছরের ধারাবাহিকতায় দেশের বৈদেশিক মুদ্রার মজুত বা রিজার্ভে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, রিজার্ভ বেড়ে ৩৬ দশমিক ৩৯ বিলিয়ন (৩ হাজার ৬৩৯ কোটি) ডলারে দাঁড়িয়েছে, যা দিয়ে চার মাসের আমদানি ব্যয় মেটানো সম্ভব।
আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুযায়ী তিন মাসের আমদানি ব্যয়ের সমপরিমাণ সঞ্চয় থাকলেই অর্থনীতিকে ঝুঁকিমুক্ত ধরা হয়। ফলে বৈশ্বিক বাজার ও মধ্যপ্রাচ্য সংকটের মধ্যে এটি জাতীয় অর্থনীতিতে বড় ধরনের স্বস্তি এনে দিয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব মতে, বিগত ছয় মাসে রিজার্ভের পরিমাণ বেড়েছে প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলার। গত সপ্তাহেও মোট রিজার্ভ সাড়ে ৩৭ বিলিয়ন ডলার অতিক্রম করেছিল, তবে ১.৩৯ বিলিয়ন ডলার আন্তর্জাতিক দেনা পরিশোধের পর তা ৩৬.৩৯ বিলিয়নে স্থির হয়।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (IMF) শর্ত অনুযায়ী প্রকৃত রিজার্ভ অর্থাৎ ‘বিপিএম ৬’ (BPM6) প্রাক্কলন অনুযায়ী বর্তমানে সঞ্চিত বৈদেশিক মুদ্রার পরিমাণ ৩১ বিলিয়ন ডলারের বেশি (৩ হাজার ৪৭৪ কোটি ডলার)।
২০২১ সালের আগস্টে দেশের রিজার্ভ রেকর্ড ৪৮ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছালেও, ২০২২ সালে ইউক্রেন যুদ্ধ, আমদানিনির্ভরতা ও নীতিগত অব্যবস্থাপনার কারণে মারাত্মক ডলার-সংকট দেখা দেয়। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের আগে তা নেমে আসে ২৫.৯২ বিলিয়ন ডলারে।
পরবর্তীতে অন্তর্বর্তী সরকার ও বর্তমান বিএনপি সরকারের আমলে মুদ্রাবাজারে সমন্বিত তদারকি, ডলারের বিনিময় হার বাজারভিত্তিককরণ এবং প্রবাসী আয়ের প্রবাহ বৃদ্ধি পাওয়ায় রিজার্ভ দ্রুত পুনরুদ্ধারের পথে হাঁটে। টানা ছয় মাস ধরে প্রবাসীদের থেকে ৩ বিলিয়ন ডলারের বেশি রেমিট্যান্স আয় এ ক্ষেত্রে মুখ্য ভূমিকা পালন করেছে।
সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান জানান, “দেড়-দুই বছর ধরে বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখা সম্ভব হয়েছে এবং রেমিট্যান্স বেড়েছে। ভালো রিজার্ভ থাকায় মধ্যপ্রাচ্য সংকটের মধ্যেও জ্বালানি আমদানির বাড়তি খরচ এবং বিদেশি ঋণ শোধ করা যাচ্ছে”।
রিজার্ভ বৃদ্ধি পেলেও অর্থনীতির অভ্যন্তরীণ সূচকে কিছু স্থবিরতা রয়ে গেছে। উদ্যোক্তাদের মাঝে নতুন বিনিয়োগে মন্দা থাকায় শিল্পের মূলধনি যন্ত্রপাতি ও কাঁচামাল আমদানির চাহিদা বিগত বছরের তুলনায় কিছুটা কমেছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, ভবিষ্যতে অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগ চাঙা হলে এবং আমদানির চাহিদা বৃদ্ধি পেলে রিজার্ভের ওপর নতুন করে চাপ সৃষ্টি হতে পারে। বিশেষ করে ২০২৯ সালের মধ্যে প্রায় ৭ বিলিয়ন ডলারের বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
সিপিডির মতে, রিজার্ভের এই ধারা ধরে রাখতে মূলত ৪টি বিষয়ে সতর্ক নজর রাখতে হবে:
বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখা। বিদেশি ঋণ শোধের চাপ সামাল দেওয়া। বিনিয়োগ বাড়লে আমদানি সক্ষমতার ভারসাম্য বজায় রাখা। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি ও অন্যান্য পণ্যের দাম বাড়লে আমদানির চাপ সামলানো।