রাজধানী ঢাকা জুড়ে একদিনে ছয়টি ভিন্ন স্থানে অন্তত ১০টি ককটেল বিস্ফোরণ এবং পরবর্তীতে কাফরুলে ফাঁকা বাসে অগ্নিসংযোগ ও বিটিভি ভবনের সামনে বিস্ফোরণের ঘটনা জনমনে তীব্র আতঙ্ক ও উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। উড়ালসড়কের উপর থেকে ককটেল ছুড়ে অটোরিকশাচালককে আহত করা কিংবা সরকারি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও থানার ফটককে লক্ষ্যবস্তু বানানো কোনো সাধারণ অপরাধমূলক ঘটনা নয়; বরং এটি পরিকল্পিতভাবে নগরে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি এবং দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির সুযোগ নেওয়ার অপচেষ্টা।
গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী গণতান্ত্রিক ধারায় উত্তরণের এই সময়ে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটানো এবং অস্থিতিশীলতা তৈরি করার যেকোনো পাঁতারা কঠোরভাবে দমন করা জরুরি।
পুলিশের তদন্ত ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, নিষিদ্ধ ঘোষিত দল ও পরাজিত সন্ত্রাসী গোষ্ঠী ঝটিকা মিছিল ও নাশকতামূলক ককটেল বিস্ফোরণের মাধ্যমে নিজেদের অস্তিত্ব জাহির করার পাশাপাশি একটি অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি করতে চাইছে। এই ধরনের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড জনজীবনের নিরাপত্তা বিঘ্নিত করার পাশাপাশি জাতীয় অর্থনীতি ও সামগ্রিক স্থিতিশীলতার জন্য চরম হুমকি।
রাজধানীর ব্যস্ততম পয়েন্ট ও উড়ালসড়কগুলোকে ব্যবহার করে যেভাবে দুষ্কৃতকারীরা ককটেল নিক্ষেপ করে পালিয়ে যাচ্ছে, তাতে পুলিশি টহল ও গোয়েন্দা তৎপরতার গভীর ঘাটতি ফুটে ওঠে।
ককটেল নিক্ষেপের প্রধান মাধ্যম হিসেবে ফ্লাইওভারগুলো ব্যবহৃত হচ্ছে। এসব উড়ালসড়কে সিসিটিভি ক্যামেরা সচল করা এবং রাতের বেলায় টহল বাড়ানো প্রয়োজন। ডিএমপির পক্ষ থেকে তথ্যপ্রযুক্তি ও গোয়েন্দা তথ্যের ওপর ভিত্তি করে জড়িতদের গ্রেপ্তারের কথা বলা হয়েছে। তবে তা যেন শুধু আশ্বাসে সীমাবদ্ধ না থেকে দৃশ্যমান ও দ্রুততম আইনি পদক্ষেপে রূপান্তরিত হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে।
রাজনৈতিক প্রতিশোধ বা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের মূল শিকার হন সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ। যেমনটা ঘটেছে যাত্রাবাড়ীতে ককটেল হামলায় আহত অটোরিকশাচালকের ক্ষেত্রে।
কোনো রাজনৈতিক ব্যানার বা পেছনের শক্তিকে ছাড় না দিয়ে ককটেল হামলা ও অগ্নিসংযোগে জড়িত প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ পরিকল্পনাকারীদের অবিলম্বে আইনের আওতায় নিয়ে আসতে হবে। প্রতিটি ওয়ার্ড ও থানায় নাগরিকদের সাথে সমন্বয় করে সন্দেহভাজন চলাচলের ওপর নজরদারি বাড়ানো এবং সচেতনতা গড়ে তোলা প্রয়োজন।
রাজধানীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কেবল ডিএমপি বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিয়মিত দায়িত্ব নয়; এটি রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতার মূল শর্ত। নিষিদ্ধ ও সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর এরকম নাশকতা রুখে দিতে হলে পুলিশ বাহিনীকে অতীতের চেয়ে আরও বেশি সতর্ক, পেশাদার ও গতিশীল হতে হবে। কোনো অবস্থাতেই সন্ত্রাসী চক্র যেন রাজধানী শহরকে জিম্মি করতে না পারে—এটাই সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা।
লেখক: রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান, বিশিষ্ট কলামিস্ট, রাজনীতিবিদ ও রাষ্ট্রচিন্তক।