সম্পাদকীয়

ধর্মীয় অনুভূতির অপব্যবহার প্রতিরোধ ও অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ আমাদের প্রত্যাশা : রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান

একটি গণতান্ত্রিক, বৈষম্যহীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র কাঠামোর স্থায়িত্ব নির্ভর করে তার অভ্যন্তরীণ শান্তিশৃঙ্খলা এবং সব ধর্মের মানুষের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের ওপর। চব্বিশের ঐতিহাসিক ছাত্র-জনতার জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর গঠিত নতুন বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয় প্রতিটি স্তরে যখন সংস্কারের সুবাতাস বইছে, তখন সমাজকে অস্থিতিশীল করার জন্য যেকোনো ধরনের অপতৎপরতার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়া রাষ্ট্রের প্রধান দায়িত্ব।

গত বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে সমসাময়িক বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আয়োজিত এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহ উদ্দিন আহমদ দেশের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা ও ভূ-রাজনৈতিক নিরাপত্তা নিয়ে সরকারের যে দৃঢ় অবস্থান তুলে ধরেছেন, তা অত্যন্ত সময়োপযোগী এবং তাৎপর্যপূর্ণ।

বিশেষ করে, দেশের কিছু স্থানে আরবি হরফ লেখা পতাকা প্রদর্শনের ঘটনাকে কেন্দ্র করে ধর্মীয় অনুভূতিকে অপব্যবহারের যে চেষ্টা হতে পারে বলে তিনি যে সতর্কবার্তা দিয়েছেন, তা দেশের অসাম্প্রদায়িক চেতনাকে সুরক্ষিত রাখতে অত্যন্ত জরুরি একটি পদক্ষেপ।

ব্রিফিংয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অত্যন্ত বাস্তবসম্মত একটি সত্য উন্মোচন করেছেন। তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন যে, কিছু বিচ্ছিন্ন মানুষ বা চরমপন্থী সংগঠন ধর্মীয় অনুভূতিকে পুঁজি করে নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির অপচেষ্টা চালাতে পারে; তবে বাংলাদেশে এই মুহূর্তে সুসংগঠিত কোনো জঙ্গিবাদী তৎপরতা বা বড় ধরনের উগ্রবাদী সংগঠনের কোনো অস্তিত্ব নেই। এটি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে এবং দেশের নাগরিকদের মনে এক বিশাল স্বস্তি এনে দিয়েছে।

বিগত দিনে আমরা দেখেছি, কীভাবে ‘জঙ্গিবাদ’-এর জুজু দেখিয়ে সাধারণ মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার হরণ করা হয়েছিল এবং ভিন্নমতাবলম্বীদের ওপর দমন-পীড়ন চালানো হয়েছিল। বর্তমান সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এই নির্মোহ ও বস্তুনিষ্ঠ মূল্যায়ন প্রমাণ করে যে, সরকার সস্তা প্রোপাগান্ডায় বিশ্বাসী নয়। এর পাশাপাশি উগ্রবাদী বা মৌলবাদী কোনো শক্তির উত্থান কোনোভাবেই ঘটতে দেওয়া হবে না বলে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যে নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তা নতুন বাংলাদেশকে একটি উদার ও প্রগতিশীল রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বমঞ্চে টিকিয়ে রাখতে সাহায্য করবে।

এই সংবাদ ব্রিফিংয়ের পরিধি কেবল ধর্মীয় ও নিরাপত্তা ইস্যুর মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং তা ছিল নতুন সরকারের সার্বিক রাজনৈতিক জবাবদিহিতার এক উজ্জ্বল দলিল। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদদের নিখুঁত তালিকা প্রণয়ন, শিক্ষার্থীদের যৌক্তিক আন্দোলনের প্রতি সংবেদনশীলতা এবং পুলিশের বিরুদ্ধে ওঠা বিগত আমলের অভিযোগগুলোর সুষ্ঠু তদন্তের যে আশ্বাস তিনি দিয়েছেন, তা জনমনে প্রশাসনের প্রতি হারানো আস্থা ফিরিয়ে আনবে।

বিশেষ করে, বিদেশে পলাতক আসামিদের প্রত্যর্পণ এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে এনে চব্বিশের গণহত্যার বিচার নিশ্চিত করার বিষয়ে সরকারের যে আইনি ও কূটনৈতিক তৎপরতার কথা তিনি উল্লেখ করেছেন, তা আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য অবিকল্প। একই সাথে, রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগের বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে আইনগত পথে হাঁটার বার্তাটি প্রতিশোধের রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠনের ইঙ্গিত দেয়।

তবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এই চমৎকার নীতিগত অবস্থানের প্রকৃত সফলতা নির্ভর করছে মাঠপর্যায়ে এর শতভাগ ও নিরপেক্ষ বাস্তবায়নের ওপর। দেশের একশ্রেণীর অতি-উৎসাহী বা স্বার্থান্বেষী মহল যেন ধর্মীয় প্রতীক ব্যবহার করে সমাজে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট করতে না পারে, সেজন্য গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করতে হবে।

পাশাপাশি, মাদকবিরোধী অভিযানকে কোনো প্রকার রাজনৈতিক প্রভাব বা স্বজনপ্রীতির ঊর্ধ্বে রেখে সম্পূর্ণ টেকসই করতে হবে, যা তরুণ প্রজন্মকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করবে।

আমরা বিশ্বাস করি, জুলাই বিপ্লবের মূল স্পিরিটই ছিল একটি সাম্য ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠন, যেখানে ধর্মের নামে কোনো শোষণ বা বৈষম্য থাকবে না। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহ উদ্দিন আহমদের এই সময়োপযোগী ও প্রাজ্ঞ নির্দেশনার আলোকে প্রশাসন ও দেশের আপামর সাধারণ মানুষ যদি একযোগে কাজ করে, তবে কোনো অপশক্তিই নতুন বাংলাদেশের অগ্রযাত্রাকে ব্যাহত করতে পারবে না—এটাই আমাদের দৃঢ় প্রত্যাশা।

লেখক: রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান, বিশিষ্ট লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।

Related News

‘ইউনিভার্সাল কার্ড’ করুণা নয়, রাষ্ট্রের দায় মেটানোর যুগান্তকারী ইশতেহার : রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান

বাজেট অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান কর্তৃক কৃষক, ফ্যামিলি ও প্রবাসী কার্ড একীভূত করে ‘ইউনিভার্সাল কার্ড’ চালুর ঐতিহাসিক ঘোষণা। রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসানের বিশেষ কলাম।

বন্যা মোকাবিলা ও ক্ষতিগ্রস্তদের টেকসই পুনর্বাসনে সরকারের করণীয় : রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান

দেশের সার্বিক বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় উদ্ধার অভিযান, স্বচ্ছ ত্রাণ বিতরণ এবং বন্যা-পরবর্তী পুনর্বাসন নিয়ে রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসানের বিশেষ সম্পাদকীয় কলাম।

স্থায়ী কমিটির নীতি-কৌশল ও নতুন বাংলাদেশ, ইশতেহার বাস্তবায়ন এবং কূটনৈতিক সাফল্যের এক সুসংহত চালচিত্র : রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সভার বিশ্লেষণ। নির্বাচনী ইশতেহার, চীন-মালয়েশিয়া সফর ও জাতিসংঘে বাংলাদেশের অর্জন নিয়ে রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসানের বিশেষ কলাম।

মানবিক চিকিৎসাসেবা ও স্বাস্থ্য খাতের আধুনিকায়ন, আস্থা পুনর্গঠনে সরকারের যুগান্তকারী রোডম্যাপ : রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান

ঢামেকের ৮১তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ঐতিহাসিক বক্তব্য। ১ লাখ স্বাস্থ্যকর্মী ও ৫ হাজার চিকিৎসক নিয়োগসহ স্বাস্থ্য খাতের রূপান্তরে বিশেষ কলাম।

আকস্মিক বন্যা মোকাবিলায় প্রধানমন্ত্রীর তড়িৎ নির্দেশনা এবং আমাদের সম্মিলিত দায়িত্ব : রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান

সারাদেশে ভারী বর্ষণ ও বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে দাঁড়াতে প্রশাসন ও নেতা-কর্মীদের কড়া নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসানের বিশেষ কলাম।

স্নাতক পর্যন্ত অবৈতনিক নারী শিক্ষা সহায়তার ঘোষণা, এক সুদূরপ্রসারী ও সাম্যবাদী রাষ্ট্রদর্শনের রূপরেখা : এম. নাজমুল হাসান

জাতীয় সংসদে বাজেট অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ঐতিহাসিক ঘোষণা। মেয়েদের স্নাতক পর্যন্ত অবৈতনিক শিক্ষা, বৃত্তি এবং ১ কোটি ২০ লাখ প্রাথমিক শিক্ষার্থীকে পোশাক ও ব্যাগ দেওয়ার পরিকল্পনা।

শিশুর প্রারম্ভিক যত্ন ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গঠন, ডা. জুবাইদা রহমানের মানবিক রাষ্ট্রদর্শন: রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান

তেজগাঁও সরকারি শিশু পরিবার ও ডে কেয়ার সেন্টার পরিদর্শনে প্রধানমন্ত্রীর সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান। শিশুর প্রারম্ভিক যত্ন ও সমতাভিত্তিক সমাজ গঠনে রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসানের কলাম।

ঢাকা মেডিকেল কলেজের আট দশক, গৌরবময় ঐতিহ্য ও আধুনিক স্বাস্থ্য গবেষণার নতুন দিগন্ত : রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান

ঢাকা মেডিকেল কলেজের ৮০ বছর পূর্তি ও ৮১তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের শুভেচ্ছা বার্তা। ঢামেকের অবদান নিয়ে রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসানের বিশেষ কলাম

Search