নারী ও শিশু ধর্ষণে সাজার হার ৩% ফলে বাড়ছে অপরাধের হার!
মিরপুরের পল্লবীতে শিশু ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনায় দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভ। সাজার হার মাত্র ৩ শতাংশ হওয়ায় বাড়ছে অপরাধ। শিশু ধর্ষণ রোধে একটি সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ ও সম্পাদকীয় বিশ্লেষণ।
বাংলাদেশের বিচারিক ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো আইনের দীর্ঘসূত্রতা। একটি স্পর্শকাতর অপরাধের বিচার হতে বছরের পর বছর কেটে যায়, যার ফলে ভুক্তভোগী পরিবারগুলো এক সময় ক্লান্ত হয়ে পড়ে এবং অপরাধীরা বুক ফুলিয়ে সমাজে ঘুরে বেড়ায়। ‘প্রথম আলো’-র সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উঠে আসা ‘নারী-শিশু নির্যাতনের মামলায় মাত্র ৩ শতাংশ সাজার হার’ মূলত অপরাধীদের জন্য এক অদৃশ্য অভয়পত্র হিসেবে কাজ করছিল। এই বিচারহীনতার অন্ধকার সুড়ঙ্গে আশার আলো জ্বালিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
ত্রিশালের নজরুল মঞ্চে দাঁড়িয়ে তিনি যখন দৃঢ় কণ্ঠে বলেন, “রামিসার হত্যাকারীর সর্বোচ্চ শাস্তি ইনশাআল্লাহ আগামী এক মাসের মধ্যে নিশ্চিত করা হবে এবং সেই সর্বোচ্চ শাস্তি হবে মৃত্যুদণ্ড,” তখন দেশের সাধারণ মানুষ দীর্ঘকাল পর একজন প্রকৃত অভিভাবকের উপস্থিতি অনুভব করেছে। এই ঘোষণা প্রমাণ করে যে, বর্তমান সরকার কেবল ক্ষমতাকেন্দ্রীক নয়, বরং জনগণের জীবন ও সম্মানের সুরক্ষায় সম্পূর্ণ সংকল্পবদ্ধ।
প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্যের সবচেয়ে পরিপক্ব ও দায়িত্বশীল দিক হলো তাঁর আইনি কাঠামোর প্রতি শ্রদ্ধা। তিনি স্পষ্ট করেছেন, “বিচার প্রক্রিয়া নির্ধারিত আইনি কাঠামোর মধ্য দিয়েই সম্পন্ন হবে এবং এ বিষয়ে কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া হবে না।” অর্থাৎ, এটি কোনো সস্তা আবেগ বা বিচারবহির্ভূত ব্যবস্থার দিকে ইঙ্গিত নয়; বরং প্রচলিত আইন ও ফাস্ট-ট্র্যাক ট্রাইব্যুনালকে সর্বোচ্চ গতিশীল করে জাস্টিস ডেলিভারি সিস্টেম বা বিচার ব্যবস্থার আমূল সংস্কারের এক প্রাজ্ঞ রূপরেখা। এক মাসের মধ্যে আইনি প্রক্রিয়া মেনে সর্বোচ্চ শাস্তি কার্যকর করার এই মডেল যদি সফল হয়, তবে তা বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থার ইতিহাসে একটি ‘প্রিসিডেন্ট’ বা ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।
এটি একদিকে যেমন আমলাতান্ত্রিক ও বিচারিক অলসতাকে ভেঙে গুঁড়িয়ে দেবে, অন্যদিকে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে নিখুঁত ও দ্রুত তদন্ত রিপোর্ট দাখিলে বাধ্য করবে।
অপরাধ বিজ্ঞানের একটি মৌলিক সূত্র হলো—শাস্তির কঠোরতার চেয়ে ‘শাস্তি পাওয়াটা নিশ্চিত কি না এবং তা কত দ্রুত হচ্ছে’, তা অপরাধের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে বেশি কার্যকর ভূমিকা রাখে। প্রধানমন্ত্রী ঠিক এই মনস্তাত্ত্বিক জায়গাটিতে আঘাত করেছেন। তিনি হুশিয়ারি দিয়েছেন, যেন “ভবিষ্যতে আর কোনো ব্যক্তি এভাবে শিশু বা নারী নির্যাতন করার সাহস না পায়।” যখন সমাজ ও অপরাধী চক্র দেখবে যে রাষ্ট্রপ্রধান স্বয়ং মনিটরিং করছেন এবং অপরাধ করার ৩০ দিনের মধ্যে ফাঁসির দড়ি নিশ্চিত হচ্ছে, তখন বিকৃত লালসা চরিতার্থ করার আগে যেকোনো অপরাধীর বুক কেঁপে উঠবে। এই কঠোর বার্তাটিই সমাজে শান্তি ও শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার জন্য এই মুহূর্তে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ছিল।
দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া যেভাবে ২০০২ সালে এসিড সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে দেশকে এসিডের অভিশাপ থেকে মুক্ত করেছিলেন, আজ তাঁরই যোগ্য উত্তরসূরি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নারী ও শিশু রক্ষায় ধর্ষণের বিরুদ্ধে একই রকম অলিখিত যুদ্ধ ঘোষণা করেছেন। তবে এই ঐতিহাসিক ঘোষণাকে সফল করতে হলে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীনে একটি বিশেষ ‘মনিটরিং সেল’ গঠন করতে হবে, যা রামিসা হত্যাকাণ্ডের মামলার প্রতিদিনের অগ্রগতি তদারকি করবে। পুলিশি তদন্তে যেন কোনো ফাঁকফোকর না থাকে এবং কোনো প্রভাবশালী মহল যেন খুনি সোহেল রানাকে আড়াল করতে না পারে, তা নিশ্চিত করাই হবে বর্তমান প্রশাসনের জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।
রামিসার রক্তমাখা নিথর দেহ আজ বাংলাদেশের বিবেককে জাগিয়ে তুলেছে, আর মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সেই জাগ্রত বিবেকের কণ্ঠস্বর হয়ে খুনিদের চূড়ান্ত বার্তা দিয়েছেন। দেশবন্ধু তারেক রহমানের এই সাহসী, মানবিক ও আপসহীন পদক্ষেপকে আমরা গভীরভাবে স্বাগত জানাই। ৩০ দিনের মধ্যে রামিসার খুনির ফাঁসি কার্যকর করার মাধ্যমে বাংলাদেশ থেকে শিশু ও নারী নির্যাতনের অন্ধকার অধ্যায় চিরতরে অবসান ঘটবে এবং দেশ একটি নিরাপদ, ইনসাফভিত্তিক ও মানবিক রাষ্ট্রে পরিণত হবে—এটাই আজ কোটি বাঙালির প্রত্যাশা।