বছর ঘুরে আবার আমাদের মাঝে ফিরে এসেছে পবিত্র ঈদ-উল-আযহা। আত্মত্যাগ, সহমর্মিতা এবং আল্লাহর প্রতি পরম আনুগত্যের এক অনন্য দৃষ্টান্ত এই উৎসব। তবে এবারের ঈদের আনন্দ এ দেশের সাধারণ মানুষের কাছে একটু ভিন্ন মাত্রায়, ভিন্ন আবহে ধরা দিয়েছে।
বিগত বছরগুলোতে ঈদের আগে যেখানে সাধারণ মানুষের মনে তাড়া করত দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির আতঙ্ক, ঢাকা ছাড়ার পথে যাতায়াতের সীমাহীন ভোগান্তি আর কোরবানির পশুর হাটের নানামুখী অব্যবস্থাপনা—সেখানে এবারের চিত্র অনেকটাই ব্যতিক্রম। বর্তমান সরকারের কার্যকর নানামুখী পদক্ষেপ, কঠোর প্রশাসনিক নজরদারি এবং সুশাসনের সুফল আজ দেশের প্রতিটি স্তরে দৃশ্যমান।
দেশের সার্বিক পরিস্থিতিতে স্বস্তির এই সুবাতাস ঈদ উদযাপনে যোগ করেছে এক নতুন ও আনন্দময় মাত্রা।
উৎসবের দিনগুলোতে মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তের সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা থাকে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজার। অতীতে সিন্ডিকেট ও কৃত্রিম সংকটের কারণে ঈদের আগে যেভাবে মসলা, তেলসহ অন্যান্য পণ্যের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যেত, এবার সরকার সেখানে শক্ত লাগাম টেনে ধরেছে। জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর এবং স্থানীয় প্রশাসনের নিরলস বাজার মনিটরিংয়ের ফলে অসাধু চক্র এবার কোনো কারসাজি করার সুযোগ পায়নি।
মূল্যস্ফীতির বৈশ্বিক চাপের মধ্যেও নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে ধরে রাখা সরকারের অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক দক্ষতার একটি বড় প্রমাণ। বাজারের এই স্থিতিশীলতা প্রতিটি পরিবারকে স্বস্তিতে ঈদ উদযাপনের সুযোগ করে দিয়েছে।
নাড়ির টানে বাড়ি ফেরা মানুষের জন্য অতীতে মহাসড়কগুলো যেন এক একটি দুঃস্বপ্নের নাম ছিল। ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজট, ফিটনেসবিহীন গাড়ি এবং অতিরিক্ত ভাড়ার নৈরাজ্য এবার শক্ত হাতে দমন করা হয়েছে। সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের দূরদর্শী পরিকল্পনা এবং হাইওয়ে পুলিশের কঠোর নজরদারির কারণে এবার মহাসড়কগুলোতে যান চলাচল রয়েছে সম্পূর্ণ স্বাভাবিক ও গতিশীল।
রেল ও নৌ-পথেও শৃঙ্খলার আমূল পরিবর্তন এসেছে। টিকিট কালোবাজারি পুরোপুরি বন্ধ হওয়ায় সাধারণ যাত্রীরা কোনো হ্যারাসমেন্ট ছাড়াই নিরাপদে তাঁদের গন্তব্যে পৌঁছাতে পারছেন। নিরাপদ যাতায়াতের এই আধুনিক ও সুশৃঙ্খল পরিবেশ মূলত একটি কল্যাণকামী রাষ্ট্রেরই প্রতিচ্ছবি।
কোরবানির ঈদকে কেন্দ্র করে সারা দেশে পশুর হাটগুলোর নিরাপত্তা এবং জাল টাকার কারবার রোধে সরকার আগে থেকেই জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছিল। প্রতিটি হাটে পর্যাপ্ত পুলিশ ও র্যাবের টহল, সিসিটিভি ক্যামেরার নজরদারি এবং ডিজিটাল পেমেন্ট বুথের সুব্যবস্থা থাকায় ক্রেতা ও বিক্রেতারা কোনো ধরনের হয়রানি বা অজ্ঞানপার্টি-মলমপার্টির খপ্পরে না পড়ে স্বাচ্ছন্দে লেনদেন করতে পারছেন।
এছাড়া ঈদে ফাঁকা হয়ে যাওয়া শহরের আবাসিক এলাকাগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বিশেষ টহল জোরদার করেছে। অপরাধ দমনে জিরো টলারেন্স নীতি বজায় রাখায় দেশের সার্বিক আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি এখন পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে।
বর্তমান সরকার দেশ পরিচালনার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই প্রতিটি সংবেদনশীল খাতে যে পদ্ধতিগত সংস্কার শুরু করেছিল, এবারের ঈদ-উল-আযহার সার্বিক ব্যবস্থাপনাই তার বড় প্রমাণ। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার, প্রশাসনের জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণ এবং মাঠ পর্যায়ের কঠোর তদারকির ফলেই আজ দেশের মানুষ একটি নিরাপদ ও স্বস্তিদায়ক পরিবেশ উপভোগ করতে পারছেন।
ঈদ-উল-আযহার মূল শিক্ষাই হলো ত্যাগের মাধ্যমে মানুষের কল্যাণে নিজেকে উৎসর্গ করা। পশুর কোরবানির পাশাপাশি আমাদের মনের ভেতরের হিংসা, বিদ্বেষ, অহংকার ও লালসাকে কোরবানি দিতে হবে। সরকারের তৈরি করে দেওয়া এই চমৎকার ও নিরাপদ সামাজিক পরিবেশকে কাজে লাগিয়ে আমাদের প্রতিবেশীদের, বিশেষ করে সমাজের সুবিধাবঞ্চিত ও দরিদ্র মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে হবে। তবেই ঈদের আনন্দ পূর্ণতা পাবে।
দেশের সব নাগরিককে সুশাসন ও স্বস্তির এই শুভক্ষণে জানাই পবিত্র ঈদ-উল-আযহার আন্তরিক শুভেচ্ছা। **ঈদ মোবারক!**
লেখক: আতাউর রহমান মিন্টু, সম্পাদক ও প্রকাশক, দৈনিক শব্দমিছিল।