সম্পাদকীয়

টানা রপ্তানি পতন ও তৈরি পোশাক খাতের সংকট: অভ্যন্তরীণ সক্ষমতা বৃদ্ধির বিকল্প নেই

একটি দেশের অর্থনৈতিক স্বাস্থ্যের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হলো তার রপ্তানি বাণিজ্য। কিন্তু বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের সেই প্রধান খুঁটিতেই এখন বড় ধরনের টান পড়েছে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) সর্বশেষ প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের ১১ মাসের মধ্যে ৯ মাসেই দেশের রপ্তানি আয় কমেছে। মে ২০২৬-এ দেশের রপ্তানি আয় হয়েছে ৪৪০ কোটি ২৮ লাখ ডলার, যা আগের বছরের একই মাসের তুলনায় ৭.০৯ শতাংশ কম।

মে মাসের এই পতনের পেছনে ‘ঈদের ছুটি’-কে সাময়িক অজুহাত হিসেবে দাঁড় করানো হলেও, রপ্তানিকারক ও অর্থনীতিবিদদের মতে সংকটের মূল কারণগুলো আসলে আরও অনেক গভীরে প্রোথিত। বৈশ্বিক চাহিদার মন্দাভাব এবং দেশের ভেতরের কাঠামোগত দুর্বলতা—উভয় সংকটের মুখে পড়ে আমাদের রপ্তানি খাত এখন এক বড় ধরনের অস্তিত্বের লড়াইয়ে অবতীর্ণ হয়েছে।

খাতভিত্তিক চিত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, দেশের মোট রপ্তানি আয়ের সিংহভাগ অর্জনকারী তৈরি পোশাক খাত চলতি অর্থবছরের জুলাই-মে সময়ে ৩.৪১ শতাংশ কমেছে। এই ১১ মাসে তৈরি পোশাক খাত থেকে আয় হয়েছে ৩ হাজার ৫৩১ কোটি ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ৩ হাজার ৬৫৫ কোটি ডলার। এর মধ্যে নিটওয়্যার রপ্তানি ৪.২৬ শতাংশ এবং ওভেন পোশাক রপ্তানি ২.৪২ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। দেশের প্রধানতম বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী খাতের এই ধারাবাহিক পতন সামগ্রিক অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি ডেকে এনেছে, যা কোনোভাবেই হালকা করে দেখার সুযোগ নেই।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের সম্মানীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমানের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এই নেতিবাচক প্রবৃদ্ধির পেছনে বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ উভয় ধরনের চ্যালেঞ্জ কাজ করছে। একদিকে ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার মতো আমাদের প্রধান বাজারগুলোতে মূল্যস্ফীতি ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে ভোক্তারা অপ্রয়োজনীয় খরচ কমিয়ে দিয়েছে, যার ফলে নতুন ক্রয়াদেশ বা আন্তর্জাতিক অর্ডারের তীব্র ঘাটতি দেখা দিয়েছে। অন্যদিকে চলমান ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা ও যুদ্ধ বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থাকে ব্যাহত করছে।

কিন্তু বৈশ্বিক সংকটের চেয়েও আমাদের ভাবিয়ে তুলছে অভ্যন্তরীণ সীমাবদ্ধতাগুলো। বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম স্পষ্ট করেছেন যে, ক্রেতারা অর্ডারের পরিমাণ কমিয়ে দিচ্ছেন। আর দেশের ভেতরে ক্রমাগত উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ তথা জ্বালানি সরবরাহের তীব্র সংকট, টাকার বিনিময় হারের ওঠানামা এবং কাস্টমস ও বন্দরসহ অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা দেশীয় উদ্যোক্তাদের আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগী সক্ষমতা মারাত্মকভাবে কমিয়ে দিচ্ছে।

এতসব হতাশার মাঝেও কিছু খাতের ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি আমাদের আশার আলো দেখাচ্ছে। ইপিবির তথ্যমতে—চলতি অর্থবছরে ওষুধ রপ্তানি ১০.৭৩ শতাংশ, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য ৩.৭৪ শতাংশ এবং সাইকেল রপ্তানি রেকর্ড ২৮.৩১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এছাড়া হোম টেক্সটাইল, প্লাস্টিক ও পাটজাত পণ্যেও ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে।

সবচেয়ে বড় স্বস্তির বিষয় হলো, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ স্পেন, নেদারল্যান্ডস, পোল্যান্ড, কানাডা, চীন, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং সৌদি আরবের মতো বাজারগুলোতে বাংলাদেশি পণ্যের রপ্তানি ইতিবাচক ধারায় রয়েছে। এটি প্রমাণ করে যে, সঠিক নীতি সহায়তা পেলে আমাদের পণ্যের বৈশ্বিক বাজারে টিকে থাকার সক্ষমতা এখনো ফুরিয়ে যায়নি।

বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা বা যুদ্ধ পরিস্থিতি বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রণে নেই, তবে অভ্যন্তরীণ সক্ষমতা বাড়িয়ে আমরা অবশ্যই এই ধাক্কা সামাল দিতে পারি।

তৈরি পোশাকের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা কমিয়ে ওষুধ, চামড়া, আইসিটি, কৃষি প্রক্রিয়াজাত পণ্য এবং হালকা প্রকৌশল খাতকে শক্তিশালী আর্থিক প্রণোদনা দিতে হবে।

কলকারখানায় নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। উৎপাদন ব্যয় না কমলে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগী দেশগুলোর সাথে বাংলাদেশ টিকে থাকতে পারবে না।

বন্দরগুলোতে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দূর করে দ্রুত কাস্টমস ক্লিয়ারেন্স ও সহজ লজিস্টিকস সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে ‘লিড টাইম’ কমিয়ে আনা যায়।

রপ্তানি খাতের এই মন্থর গতি কেবল একটি খাতের সমস্যা নয়, এটি দেশের কর্মসংস্থান, শিল্পায়ন এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের সাথে সরাসরি যুক্ত। সরকার যদি এখনই উৎপাদনমুখী শিল্প খাতকে বাঁচাতে বিশেষ ‘জ্বালানি ও কর প্রণোদনা’ নিশ্চিত করতে না পারে, তবে আগামী দিনগুলোতে এই সংকট আরও ঘনীভূত হতে পারে।

আমরা আশা করব, বর্তমান বিএনপি সরকার এবং সংশ্লিষ্ট বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ইপিবির এই পরিসংখ্যানকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে একটি সমন্বিত কৌশলগত মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করবে এবং দেশের রপ্তানি খাতকে আরও সহনশীল, বহুমুখী ও টেকসই করে তুলতে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেবে।

লেখক: রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান, বিশিষ্ট লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।

Related News

বিদ্যুৎ ও জ্বালানিসংকট রোডম্যাপ ২০৩০ : রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান

সংসদে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট নিয়ে আলোচনা, সরকারি দলের ‘উই হ্যাভ এ প্ল্যান’ এবং বিরোধী দলের প্রস্তাবিত যৌথ টাস্কফোর্স গঠনের ওপর বিশেষ সম্পাদকীয়।

বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তার নতুন ঝুঁকি ও উত্তরণের পথ : রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান

দেশীয় সার কারখানায় গ্যাস-সংকট, বৈশ্বিক মূল্যবৃদ্ধি ও খাদ্য নিরাপত্তার ঝুঁকিতে করণীয় সম্পর্কে বিশদ বিশ্লেষণমূলক সম্পাদকীয়।

জীবনকালীন ভোগাধিকার আইন ও সামাজিক বাস্তবতার ভারসাম্য : রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান

পিতা-মাতার ভোগাধিকার রক্ষা করে সম্পত্তি হস্তান্তর আইন পাস এবং শরিয়াহ বিষয়ক বিতর্কের বিষয়ে উভয়পক্ষের নিরপেক্ষ মূল্যায়নধর্মী বিশেষ সম্পাদকীয়।

জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় দূরদর্শী পরিকল্পনা ও জাতীয় আস্থার গুরুত্ব : রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান

বিএনপির ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বক্তব্য ও জ্বালানি সংকট সমাধানের মহাপরিকল্পনার ওপর বিশেষ সম্পাদকীয়।

জ্বালানি সংকটে শত শত গাড়ির লংমার্চ বিরোধী দলের রাজনৈতিক দায়িত্বশীলতার প্রশ্ন : রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান

এনসিপি ও ১১-দলীয় ঐক্যের চার বিভাগীয় লংমার্চের যৌক্তিকতা এবং চলমান জ্বালানি সংকটে সম্পদ সংরক্ষণের আহ্বান জানিয়ে বিশেষ সম্পাদকীয়।

২০৩৪ সালের মধ্যে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণে বৈচিত্র্যময় শিল্প, অর্থনৈতিক শৃঙ্খলা ও কৌশলগত অর্থায়নের নতুন পথরেখা : রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান

২০৩৪ সালের মধ্যে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি গঠনের লক্ষ্য এবং ইস্টার্ন রিফাইনারির আধুনিকায়নে আইএসডিবির অর্থায়ন চুক্তির ওপর বিশেষ সম্পাদকীয়।

৬ লাখ কোটি টাকা ছাড়াল খেলাপি ঋণ; ব্যাংকিং খাতে জরুরি সংস্কার প্রয়োজন: রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান

বাংলাদেশ ব্যাংকের জুনের তথ্য মতে খেলাপি ঋণ ৬ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। ব্যাংক খাতের সংকট, অনিয়ম ও সমাধানের ওপর বিশেষ সম্পাদকীয়।

নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতনে দূরীকরণে প্রয়োজন আইনের কঠোর প্রয়োগ ও দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন : রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের তথ্য মতে আগস্টে ২৫২ জন নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতনের শিকার। আইন প্রয়োগ ও সুরক্ষার ওপর বিশেষ সম্পাদকীয়।

Search