শোক সংবাদ: এক রত্নগর্ভা মাতার বিদায় ও অপূরণীয় ক্ষতি
‘জীবন স্রোত’ সম্পাদক ডাক্তার বদরুজ্জামান ও দৈনিক ‘শব্দ মিছিল’ সম্পাদক মোল্লা আতাউর রহমান মিন্টুর মাতা কুলসুম বেগমের ইন্তেকালে গভীর শোক প্রকাশ ও শোক সম্পাদকীয়
দেশের সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দীর্ঘদিনের যৌক্তিক দাবি ও প্রত্যাশার অবসান ঘটিয়ে আগামী ১ জুলাই থেকে নবম জাতীয় পে-স্কেল কার্যকরের নীতিগত প্রস্তুতি নিচ্ছে সরকার। অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর ঘোষণা অনুযায়ী, নতুন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের শুরু থেকেই এই নতুন বেতন কাঠামো কার্যকর করার লক্ষ্যে চলতি জুন মাসের মধ্যেই সরকারি গেজেট বা প্রজ্ঞাপন প্রকাশের জোর প্রস্তুতি চলছে।
বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ নানামুখী অর্থনৈতিক সংকটের এই সময়ে সরকারের এই সাহসী ও কল্যাণমুখী সিদ্ধান্তকে আমরা স্বাগত জানাই। তবে এই বিশাল অর্থযজ্ঞ এক ধাপে বাস্তবায়ন না করে তিন ধাপে সম্পন্ন করার যে কৌশলগত পথ সরকার বেছে নিয়েছে, তা একদিকে যেমন রাষ্ট্রীয় আর্থিক সক্ষমতার বাস্তবসম্মত প্রতিফলন, অন্যদিকে উচ্চ মূল্যস্ফীতির বাজারে কর্মচারীদের একটি বড় অংশের মাঝে নতুন অসন্তোষের জন্ম দিয়েছে।
২০১৫ সালের পর দীর্ঘ ১১ বছর পেরিয়ে গেলেও নতুন কোনো পূর্ণাঙ্গ পে-স্কেল না আসায় বর্তমান উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের সাথে সরকারি কর্মচারীরা, বিশেষ করে নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীরা রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছিলেন। প্রস্তাবিত নতুন কাঠামোতে বিদ্যমান ২০টি গ্রেড বহাল রেখে সর্বনিম্ন মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে এক লাফে ২০ হাজার টাকা এবং প্রথম গ্রেডের সর্বোচ্চ বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা করার যে সুপারিশ করা হয়েছে, তা অত্যন্ত সময়োপযোগী।
একই সাথে এই পে-স্কেলের আওতায় প্রায় ৯ লাখ পেনশনভোগী প্রবীণ নাগরিকদের অন্তর্ভুক্ত করা এবং বিশেষ করে কম পেনশন পাওয়া অবসরপ্রাপ্তদের পেনশন সর্বোচ্চ ১০০% পর্যন্ত হারে বাড়ানোর যে মানবিক পরিকল্পনা রয়েছে, তা প্রশংসার দাবিদার। এটি দেশের মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত শ্রেণির ক্রয়ক্ষমতা বাড়িয়ে অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিকে আরও গতিশীল করতে সাহায্য করবে।
কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী পুরো পে-স্কেল একসঙ্গে বাস্তবায়ন করতে হলে সরকারের এক লাখ কোটি টাকারও বেশি অতিরিক্ত অর্থের প্রয়োজন হবে। বর্তমান ডলার সংকট এবং রাজস্ব আদায়ের চ্যালেঞ্জিং পরিস্থিতিতে এত বড় অঙ্কের টাকা এক দফায় ছাড় করা যেকোনো সরকারের জন্যই সামষ্টিক অর্থনীতির ওপর বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
আর তাই আসন্ন বাজেটে প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকার বিশেষ থোক বরাদ্দ রেখে আগামী ১ জুলাই থেকে প্রথম ধাপে মূল বেতনের প্রায় ৫০% বৃদ্ধি কার্যকর করা এবং পরবর্তী দুই বছরে বাকি অংশ সমন্বয় করার যে সিদ্ধান্ত সরকার নিয়েছে, তা অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে বেশ দূরদর্শী ও ভারসাম্যপূর্ণ।
তবে মুদ্রাার ওপিঠে যে বাস্তব চিত্র রয়েছে, তা-ও উপেক্ষা করার মতো নয়। বিভিন্ন সরকারি কর্মচারী সংগঠনের দাবি—বর্তমান বাজারের যে অগ্নিমূল্য, তাতে ধাপে ধাপে বেতন বাড়ালে তা জীবনযাত্রার ব্যয়ের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে না। তারা এক ধাপে শতভাগ বেতন বৃদ্ধির দাবিতে অসন্তোষ প্রকাশ করছেন। সরকার যখন আমলাতন্ত্রকে আরও দক্ষ, সৎ ও দুর্নীতিমুক্ত করতে চাচ্ছে, তখন কর্মচারীদের জীবনযাত্রার মান নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব।
নতুন পে-স্কেল ঘোষণার সাথে সাথে দুটি বড় চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে যাচ্ছে সরকার, যা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি:
ইতিহাস সাক্ষী, সরকারি কর্মচারীদের বেতন বাড়ার ঘোষণা আসার সাথে সাথেই দেশের অসাধু ব্যবসায়ী ও বাজার সিন্ডিকেটগুলো নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র ও বাড়িভাড়ার দাম কৃত্রিমভাবে বাড়িয়ে দেয়। এর ফলে সরকারি চাকুরিজীবীদের চেয়ে বেসরকারি খাতে নিয়োজিত দেশের বিশাল সাধারণ জনগোষ্ঠী চরম বিপাকে পড়ে। তাই বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরকে এখন থেকেই কঠোর বাজার মনিটরিং নিশ্চিত করতে হবে।
কর্মচারী সংগঠনগুলোর অসন্তোষ যেন কোনো ধরনের প্রশাসনিক স্থবিরতা তৈরি করতে না পারে, সেজন্য অর্থ মন্ত্রণালয়কে তাদের প্রতিনিধিদের সাথে সরাসরি সংলাপে বসতে হবে এবং সরকারের আর্থিক সীমাবদ্ধতার বিষয়টি বুঝিয়ে একটি সৌহার্দ্যপূর্ণ সমঝোতায় আসতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের অনুমোদন পাওয়ার পরপরই এই ঐতিহাসিক গেজেট প্রকাশিত হতে যাচ্ছে, যা দেশের সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাজের গতি ও কর্মস্পৃহা বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে বলে আমাদের বিশ্বাস। তবে বেতন বৃদ্ধির এই মহৎ উদ্যোগ তখনই সফল হবে, যখন এর সুফল কর্মচারীদের পকেটে পৌঁছানোর আগেই বাজার সিন্ডিকেটের পেটে চলে যাবে না।
লেখক: রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান, বিশিষ্ট লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক