টানা চার মাসের রক্তক্ষয়ী সংঘাতের অবসান ঘটাতে অবশেষে একটি সমঝোতা চুক্তিতে পৌঁছেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। চুক্তির প্রাথমিক রূপরেখাকে ইতিবাচকভাবে দেখা হলেও, এর মাধ্যমে কিছু রূঢ় বাস্তবতা সামনে এসেছে। এই যুদ্ধের কারণে ওয়াশিংটন সামরিক, কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে মারাত্মক চাপের মুখে পড়েছে, যার দীর্ঘমেয়াদি মাশুল দিতে হবে যুক্তরাষ্ট্রকে।
সমালোচকদের মতে, ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানে যাওয়া ছিল প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের একটি মস্ত বড় কৌশলগত ভুল। আইনি प्रक्रियाকে তোয়াক্কা না করে এবং অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসের ওপর ভর করে শুরু করা এই যুদ্ধ থেকে কাঙ্ক্ষিত কোনো লক্ষ্যই অর্জন করতে পারেনি মার্কিন প্রশাসন। চুক্তির সব শর্ত এখনো প্রকাশ না পেলেও এটি স্পষ্ট যে, ট্রাম্প যেসব কঠোর শর্ত জুড়ে দিতে চেয়েছিলেন, তার অধিকাংশেরই বাস্তবায়ন হয়নি। ফলে এই চুক্তিকে মূলত ওয়াশিংটনের একটি আপস হিসেবেই গণ্য করা হচ্ছে।
যুদ্ধ চলাকালীন ট্রাম্প বারবার দাবি করেছিলেন, মার্কিন বাহিনী ‘চূড়ান্ত বিজয়’ ছিনিয়ে আনবে এবং ইরানকে ‘বিনা শর্তে আত্মসমর্পণ’ করতে হবে। তেহরানের শাসনব্যবস্থা বদলে দেওয়া এবং তাদের পারমাণবিক সক্ষমতা পুরোপুরি মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়ার হুঁশিয়ারিও দিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু যুদ্ধ শেষে দেখা যাচ্ছে, ইরানের রাজনৈতিক নেতৃত্ব এখনো বহাল তবিয়তে টিকে আছে। পারমাণবিক ইস্যু নিয়ে আগামী দুই মাস আলোচনার কথা থাকলেও, ধারণা করা হচ্ছে এটি শেষ পর্যন্ত ২০১৫ সালের পরমাণু চুক্তির মতোই কোনো সমঝোতায় রূপ নেবে।
২০১৮ সালে ট্রাম্প ওবামা আমলের সেই পরমাণু চুক্তিকে ‘ইতিহাসের নিকৃষ্টতম চুক্তি’ আখ্যা দিয়ে বাতিল করেছিলেন। তাঁর অভিযোগ ছিল, ওই চুক্তি ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরিতে বাধা দিতে পারছে না। কিন্তু ভাগ্যের পরিহাস, যুদ্ধের পর এখন সেই একই ধরনের চুক্তির পথেই হাঁটতে হচ্ছে ওয়াশিংটনকে।
হরমুজ প্রণালী: ট্রাম্পের একমাত্র সান্ত্বনা?
যুদ্ধবিরতির এই রূপরেখায় যুক্তরাষ্ট্রের একমাত্র বড় সাফল্য হিসেবে দেখা হচ্ছে হরমুজ প্রণালী দিয়ে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল পুনরায় চালু হওয়াকে। এর ফলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম কমে আসার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, এটি আসলে যুদ্ধের আগের স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে ফিরে যাওয়া মাত্র। ইরান এই প্রণালী বন্ধ করে বিশ্ব অর্থনীতি ও মার্কিন প্রশাসনের ওপর সফলভাবে চাপ সৃষ্টি করতে পেরেছে এবং প্রমাণ করেছে যে, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে তাদের নিয়ন্ত্রণ কতটা মজবুত।
ইরানের ক্ষয়ক্ষতি ও কৌশলগত লাভ
চার মাসের যুদ্ধে ইরানের সামরিক অবকাঠামো ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। তবে যুদ্ধের পর তারা নিজেদের পুনর্গঠনের সুযোগ পেয়েছে। যদিও অর্থনৈতিক সংকট, মুদ্রাস্ফীতি এবং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপ এখনো দেশটিকে ভোগাচ্ছে, তবুও কূটনৈতিক ময়দানে তেহরান বেশ সুবিধাজনক অবস্থানে চলে এসেছে। তারা বিশ্বকে দেখিয়েছে যে, আমেরিকা ও ইসরায়েলের মতো পরাশক্তির যৌথ চাপ থাকা সত্ত্বেও তারা টিকে থাকতে সক্ষম।
মার্কিন ভাবমূর্তিতে বড় আঘাত
বিপুল সামরিক শক্তি, আধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করেও ইরানকে কাবু করতে না পারায় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব নিয়ে বিশ্বজুড়ে প্রশ্ন উঠেছে। এই ঘটনা রাশিয়া বা চীনের মতো মার্কিন প্রতিদ্বন্দ্বীদের নতুন করে ভাবাবে। এই ক্ষতি পুষিয়ে নিতে হলে ওয়াশিংটনকে এখন মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ ও এশিয়ার মিত্রদের সঙ্গে সম্পর্ক আরও জোরদার করতে হবে।
দুর্বল ইরান যেভাবে ঘুরে দাঁড়াল
যুদ্ধ শুরুর আগে ইরান বেশ কোনঠাসা অবস্থায় ছিল। ইসরায়েলের তীব্র হামলায় হামাস ও হিজবুল্লাহ দুর্বল হয়ে পড়ে এবং সিরিয়ায় ইরান-বান্ধব সরকারের পতন ঘটে। কিন্তু এই যুদ্ধের পর সমস্ত দুর্বলতা কাটিয়ে ইরান নতুন করে আমেরিকার সঙ্গে সমানে সমানে দর-কষাকষির টেবিলে ফিরে এসেছে। এখন বড় প্রশ্ন হলো, ভবিষ্যতে ইরান যদি আবারও হরমুজ প্রণালী বন্ধের হুমকি দেয়, তবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে এর কী জবাব থাকবে?