সম্পাদকীয়

বন্যা মোকাবিলা ও ক্ষতিগ্রস্তদের টেকসই পুনর্বাসনে সরকারের করণীয় : রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান

সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল এবং অবিরাম ভারী বর্ষণে সৃষ্ট আকস্মিক বন্যা লাখ লাখ মানুষের জীবনকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে। ঘরবাড়ি তলিয়ে যাওয়া, ফসলের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি এবং গবাদিপশু নিয়ে পানিবন্দী মানুষের এই হাহাকার কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং এটি আমাদের জাতীয় সংকট। দুর্যোগের এই কঠিন মুহূর্তে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে যে তড়িৎ প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, তা নিঃসন্দেহে আশাব্যঞ্জক।

তবে মাঠপর্যায়ে সেই নির্দেশনার শতভাগ ও কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। দুর্যোগের তীব্রতা বাড়ার সাথে সাথে বানভাসি মানুষের পাশে দাঁড়াতে এবং দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে সরকারের করণীয় কী, তা অত্যন্ত নির্মোহ ও সুনির্দিষ্টভাবে ভাবার সময় এসেছে।

একটি কার্যকর দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কাঠামোর প্রথম ধাপই হলো তাৎক্ষণিক উদ্ধার ও আশ্রয় নিশ্চিত করা। দুর্গম ও বিচ্ছিন্ন চরাঞ্চল বা প্লাবিত গ্রামগুলোতে যেখানে সাধারণ নৌকা পৌঁছাতে পারছে না, সেখানে সামরিক বাহিনী ও নৌবাহিনীর বিশেষ স্পিডবোট এবং উদ্ধারকারী দল পাঠিয়ে আটকে পড়া শিশু, বৃদ্ধ ও গর্ভবতী নারীদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে আশ্রয়কেন্দ্রে নিয়ে আসতে হবে।

আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে পর্যাপ্ত আলো, স্যানিটেশন এবং নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা জরুরি, যাতে দুর্যোগের সুযোগ নিয়ে কোনো অসাধু চক্র আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটাতে না পারে।

দ্বিতীয় এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়টি হলো জরুরি ত্রাণ সামগ্রী বিতরণ। সরকারি ও বেসরকারিভাবে যে ত্রাণ বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে, তা যেন প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তদের হাতে পৌঁছায়, তা নিশ্চিত করতে হবে।

ত্রাণ সামগ্রীর তালিকায় কেবল চাল বা শুকনা খাবার রাখলেই চলবে না; বরং বিশুদ্ধ পানি, পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট, ওআরএস স্যালাইন, শিশুখাদ্য এবং নারীদের প্রয়োজনীয় স্যানিটারি সামগ্রী অন্তর্ভুক্ত করা বাধ্যতামূলক।

ত্রাণ বিতরণে অতীতের আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও রাজনৈতিক স্বজনপ্রীতির চেনা সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে স্থানীয় প্রশাসন, সিভিল সার্জন, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র সমাজ এবং যুব রেড ক্রিসেন্টের মতো স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোর সমন্বয়ে একটি ‘স্বচ্ছ ডাটাবেজ’ তৈরি করতে হবে, যাতে কোনো পরিবার বারবার ত্রাণ না পায়, আবার কেউ যেন বাদও না পড়ে।

তবে বন্যার আসল চ্যালেঞ্জটি শুরু হয় পানি কমতে শুরু করলে—যাকে আমরা বন্যা-পরবর্তী পুনর্বাসন পর্যায় বলি। পানি নেমে যাওয়ার সাথে সাথে বন্যাকবলিত জেলাগুলোতে ডায়রিয়া, কলেরা, টাইফয়েড ও চর্মরোগের মতো পানিবাহিত রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়।

তাই প্রতিটি ইউনিয়নে ভ্রাম্যমাণ মেডিকেল টিম এবং পর্যাপ্ত জরুরি ওষুধের স্টক সচল রাখতে হবে। একই সাথে, বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত প্রান্তিক কৃষকদের বাঁচাতে বিনামূল্যে বীজ, সার এবং বিনাসুদে কৃষি ঋণের বিশেষ প্যাকেজ ঘোষণা করতে হবে, যেন তারা নতুন করে ঘুরে দাঁড়াতে পারেন।

গৃহহীন হয়ে পড়া পরিবারগুলোকে টিন ও নগদ অর্থ সহায়তা দিয়ে ঘরবাড়ি মেরামতের সুযোগ করে দেওয়া এবং ক্ষতিগ্রস্ত গ্রামীণ সড়ক ও কালভার্ট দ্রুত সংস্কার করা সরকারের অন্যতম শীর্ষ অগ্রাধিকার হওয়া উচিত।

চব্বিশের জুলাই বিপ্লব আমাদের যে সাম্য ও মানবিক বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখিয়েছে, তার মূল স্পিরিটই হলো বিপদে একে অপরের হাত ধরে দাঁড়ানো। সরকারের একক প্রচেষ্টায় এত বড় দুর্যোগ সামাল দেওয়া কঠিন।

তাই সরকারের এই সমন্বিত উদ্যোগের পাশাপাশি দেশের ধনাঢ্য শ্রেণী, করপোরেট প্রতিষ্ঠান এবং রোটারি ইন্টারন্যাশনালের মতো সামাজিক ও আন্তর্জাতিক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোকে একযোগে এগিয়ে আসতে হবে। দল-মত নির্বিশেষে রাজনৈতিক নেতা-কর্মী এবং প্রশাসনের আন্তরিক ও দুর্নীতিমুক্ত সেবাব্রতের মাধ্যমেই আমরা এই প্রাকৃতিক বিপর্যয় কাটিয়ে একটি স্বস্তিদায়ক, সুরক্ষিত ও মানবিক নতুন বাংলাদেশ পুনর্গঠন করতে পারব—এটাই আমাদের একমাত্র প্রত্যাশা।

লেখক: রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান, বিশিষ্ট লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।

Related News

স্থায়ী কমিটির নীতি-কৌশল ও নতুন বাংলাদেশ, ইশতেহার বাস্তবায়ন এবং কূটনৈতিক সাফল্যের এক সুসংহত চালচিত্র : রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সভার বিশ্লেষণ। নির্বাচনী ইশতেহার, চীন-মালয়েশিয়া সফর ও জাতিসংঘে বাংলাদেশের অর্জন নিয়ে রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসানের বিশেষ কলাম।

মানবিক চিকিৎসাসেবা ও স্বাস্থ্য খাতের আধুনিকায়ন, আস্থা পুনর্গঠনে সরকারের যুগান্তকারী রোডম্যাপ : রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান

ঢামেকের ৮১তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ঐতিহাসিক বক্তব্য। ১ লাখ স্বাস্থ্যকর্মী ও ৫ হাজার চিকিৎসক নিয়োগসহ স্বাস্থ্য খাতের রূপান্তরে বিশেষ কলাম।

আকস্মিক বন্যা মোকাবিলায় প্রধানমন্ত্রীর তড়িৎ নির্দেশনা এবং আমাদের সম্মিলিত দায়িত্ব : রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান

সারাদেশে ভারী বর্ষণ ও বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে দাঁড়াতে প্রশাসন ও নেতা-কর্মীদের কড়া নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসানের বিশেষ কলাম।

স্নাতক পর্যন্ত অবৈতনিক নারী শিক্ষা সহায়তার ঘোষণা, এক সুদূরপ্রসারী ও সাম্যবাদী রাষ্ট্রদর্শনের রূপরেখা : এম. নাজমুল হাসান

জাতীয় সংসদে বাজেট অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ঐতিহাসিক ঘোষণা। মেয়েদের স্নাতক পর্যন্ত অবৈতনিক শিক্ষা, বৃত্তি এবং ১ কোটি ২০ লাখ প্রাথমিক শিক্ষার্থীকে পোশাক ও ব্যাগ দেওয়ার পরিকল্পনা।

শিশুর প্রারম্ভিক যত্ন ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গঠন, ডা. জুবাইদা রহমানের মানবিক রাষ্ট্রদর্শন: রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান

তেজগাঁও সরকারি শিশু পরিবার ও ডে কেয়ার সেন্টার পরিদর্শনে প্রধানমন্ত্রীর সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান। শিশুর প্রারম্ভিক যত্ন ও সমতাভিত্তিক সমাজ গঠনে রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসানের কলাম।

ঢাকা মেডিকেল কলেজের আট দশক, গৌরবময় ঐতিহ্য ও আধুনিক স্বাস্থ্য গবেষণার নতুন দিগন্ত : রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান

ঢাকা মেডিকেল কলেজের ৮০ বছর পূর্তি ও ৮১তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের শুভেচ্ছা বার্তা। ঢামেকের অবদান নিয়ে রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসানের বিশেষ কলাম

জুলাইয়ের চেতনার সুরক্ষা ও ফ্যাসিবাদের বিচার: বিভাজন ও ব্যবসা পরিহারের রাজনীতিই হোক ভবিষ্যৎ পথরেখা

আগারগাঁওয়ে জুলাই জাতীয় সম্মেলনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য। আওয়ামী লীগের বিচার, বিএনপির সমন্বয় ও চেতনা বিক্রির ব্যবসার বিরুদ্ধে হুঁশিয়ারি।

প্রথম জাতীয় পল্লী উন্নয়ন দিবস: জিয়াউর রহমানের ১৯ দফা থেকে তারেক রহমানের আধুনিক গ্রাম দর্শন

প্রথমবারের মতো উদযাপিত হচ্ছে জাতীয় পল্লী উন্নয়ন দিবস-২০২৬। শহীদ জিয়ার ১৯ দফা ও গ্রাম সরকার থেকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আধুনিক গ্রামীণ দর্শনের ওপর সম্পাদকীয়।

Search