তরুণদের মাদকমুক্ত রাখতে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের ভূমিকার আহ্বান প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রীর
সিলেটের চালিবন্দর মহাশ্মশান কমপ্লেক্সের উদ্বোধনে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরীর বিশেষ বক্তব্য।
সংস্কৃতি একটি জাতির আত্মপরিচয় ও মনস্তাত্ত্বিক বিকাশের দর্পণ। আর যদি তা হয় লোকগীতি বা মাটির গান, তবে তা সরাসরি সংযোগ ঘটায় আমাদের শিকড়ের সাথে। চব্বিশের ঐতিহাসিক জুলাই বিপ্লব পরবর্তী নতুন বাংলাদেশে মেধা, যোগ্যতা ও তৃণমূলের প্রতিভার যে সুষম মূল্যায়নের নতুন আবহাওয়া তৈরি হয়েছে, তার এক অতি উজ্জ্বল ও গৌরবময় অধ্যায় রচিত হলো গত বুধবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ের বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলনকেন্দ্রে।
দেশব্যাপী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ২ লাখ বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির উদ্বোধনের পাশাপাশি আয়োজিত ‘জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা পদক–২০২৬’ প্রদান অনুষ্ঠানে টাঙ্গাইলের সখীপুর উপজেলার বেড়বাড়ী গ্রামের প্রত্যন্ত অঞ্চলের কৃতি কন্যা অনয়া সরকার (ইশা) লোকগীতি বিভাগে সমগ্ৰ দেশে প্রথম স্থান অধিকার করে স্বর্ণপদক জয় করেছে। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের হাত থেকে অনয়ার এই জাতীয় পদক ও গোল্ড মেডেল গ্রহণ কেবল তার ব্যক্তিগত বা পারিবারিক অর্জন নয়; বরং এটি আমাদের গ্রামীণ জনপদের সুপ্ত মেধার এক অনন্য স্বীকৃতি এবং নতুন বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তিমূলক অগ্রযাত্রার এক সার্থক স্মারক।
অনয়া সরকারের এই গৌরবোজ্জ্বল গৌরবগাথা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, একটি সফল ও সুস্থ সমাজ বিনির্মাণে পরিবার এবং শিক্ষকের ত্যাগ কতটা অপরিহার্য। কিশোরগঞ্জের শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ অ্যান্ড হাসপাতালের রেডিওলজি অ্যান্ড ইমেজিং বিভাগের মেডিকেল টেকনোলজিস্ট শংকর সরকার ও তুলি সরকার দম্পতির কন্যা অনয়া বর্তমানে কিশোরগঞ্জের গাইটাল আবদুল ওয়াহেদ জনতা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী।
ছোটবেলা থেকেই সংগীতের প্রতি তার যে প্রবল অনুরাগ, তাকে পরম যত্নে আগলে রেখেছেন তার মা এবং সংগীতগুরু বাবু অশোক কুমার বিশ্বাস। আমাদের সমাজে যখন অনেক শিশু মোবাইল ও ইন্টারনেটের ভার্চুয়াল জগতে আসক্ত হয়ে পড়ছে, তখন চতুর্থ শ্রেণির একটি শিশুর কঠোর অধ্যবসায়, নিয়মিত রেওয়াজ এবং লোকসংগীতের মতো মাটির গানের প্রতি এই একনিষ্ঠ ভালোবাসা দেশের সকল শিশু-কিশোর ও অভিভাবকদের জন্য এক বিশাল অনুপ্রেরণা।
অনয়ার বাবা শংকর সরকারের একটি বক্তব্য আমাদের অন্তরকে গভীরভাবে স্পর্শ করে। তিনি জানিয়েছেন, শৈশবে পিতৃহীন হওয়ায় তাঁর নিজের বড় বোন চরম অর্থকষ্টের কারণে গান শেখার সুযোগ পাননি।
পরিবারের সেই অপূর্ণ স্বপ্ন ও আক্ষেপকে বুকে ধারণ করেই তাঁরা চেয়েছেন লেখাপড়ার পাশাপাশি অনয়াকে সংগীতের সঠিক ও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা দিতে। এটি একটি অত্যন্ত ইতিবাচক ও প্রগতিশীল সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির বহিঃপ্রকাশ। পাঠ্যপুস্তকের চার দেয়ালের পাশাপাশি সহ-শিক্ষা কার্যক্রম বিশেষ করে গান, মেধা অন্বেষণ ও প্রাণপ্রকৃতি বিষয়ক সৃজনশীল কাজে শিশুদের সম্পৃক্ত করা হলে তাদের মনস্তাত্ত্বিক বিকাশ কতটা মহৎ হতে পারে, অনয়া তার জীবন্ত প্রমাণ।
পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে তার একটি ডুয়েট ও চারটি কোরাস গানে সুরেলা কণ্ঠ ও আত্মবিশ্বাসী পরিবেশনা দেশের শীর্ষ উলামা-মাশায়েখ, শিক্ষাবিদ এবং উপস্থিত রাষ্ট্রীয় অতিথিদের যেভাবে মুগ্ধ করেছে, তা লোকসংগীতের ভবিষ্যৎকে আরও আশাবাদি করে তোলে।
তবে জাতীয় পর্যায়ের এই অনন্য সাফল্যের পর অনয়ার মতো খুদে প্রতিভাদের ধরে রাখা এবং তাদের ভবিষ্যৎ বিকাশের পথ মসৃণ করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। অনেক সময় দেখা যায়, প্রাথমিক স্তরে জাতীয় পুরস্কার পাওয়ার পর মাধ্যমিক বা উচ্চস্তরে গিয়ে সঠিক পৃষ্ঠপোষকতা ও প্রাতিষ্ঠানিক সুযোগ-সুবিধার অভাবে অনেক মেধা অঙ্কুরেই ঝরে যায়। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতি আমাদের উদাত্ত আহ্বান থাকবে—লোকগীতি ও সংস্কৃতির এই খুদে ধারকদের জন্য বিশেষ বৃত্তি ও উন্নত প্রশিক্ষণের স্থায়ী ব্যবস্থা করা হোক, যাতে তারা আন্তর্জাতিক মঞ্চেও বাংলাদেশের মাটির গানকে তুলে ধরতে পারে।
পরিশেষে বলা যায়, ১৫ জুলাই ২০২৬-এর এই পদক বিতরণী অনুষ্ঠানটি নতুন বাংলাদেশের শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনের ইতিহাসে এক স্মরণীয় দিন হয়ে থাকবে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের হাত থেকে টাঙ্গাইল ও কিশোরগঞ্জের এই খুদে তারকার স্বর্ণপদক গ্রহণের মধ্য দিয়ে এ দেশের কোটি কোটি প্রান্তিক শিক্ষার্থীর স্বপ্ন দেখার দুয়ার আরও প্রসারিত হলো। অনয়া সরকারের এই সুরের আলো দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ুক এবং তার কঠোর অধ্যবসায় আমাদের একটি নান্দনিক, সংস্কৃতিমনস্ক ও মেধাভিত্তিক মানবিক নতুন বাংলাদেশ গড়ে তুলতে দিশারী হিসেবে কাজ করুক—এটাই আমাদের একমাত্র প্রত্যাশা।