জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা পদকে লোকগীতিতে দেশসেরা অনয়া সরকার
জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা পদক-২০২৬-এ লোকগীতি বিভাগে সারা দেশে প্রথম হয়ে প্রধানমন্ত্রীর হাত থেকে স্বর্ণপদক নিল অনয়া সরকার (ইশা)।
একটি রাষ্ট্র ও সমাজের প্রকৃত চালিকাশক্তি হলো তার তরুণ ও যুবসমাজ। চব্বিশের ঐতিহাসিক ছাত্র-জনতার জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর যে নতুন ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশের যাত্রা শুরু হয়েছে, তার মূল স্পিরিটই হলো তরুণদের মেধা, শ্রম ও নৈতিক শক্তির ওপর ভর করে একটি সমৃদ্ধ রাষ্ট্র গড়ে তোলা। তবে এই অগ্রযাত্রার পথে বর্তমান সময়ে সবচেয়ে বড় ও আশঙ্কাজনক সামাজিক ব্যাধি হয়ে দাঁড়িয়েছে মাদকের বিস্তার। তরুণদের এই মরণনেশা থেকে দূরে রেখে তাদের মেধার সঠিক মূল্যায়ন ও নৈতিক স্খলন রোধ করা আজ এক বিশাল জাতীয় চ্যালেঞ্জ। এই অত্যন্ত সংবেদনশীল ও গুরুত্বপূর্ণ প্রেক্ষাপটে আজ শুক্রবার (১৭ জুলাই, ২০২৬) সকালে সিলেটের ঐতিহ্যবাহী চালিবন্দর মহাশ্মশান কমপ্লেক্সের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী তরুণদের মাদকমুক্ত রাখতে এবং যুবসমাজকে বিপথগামিতা থেকে রক্ষা করতে দেশের সকল ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানকে আরও কার্যকর ভূমিকা রাখার যে উদাত্ত আহ্বান জানিয়েছেন, তা অত্যন্ত সময়োপযোগী, বাস্তবমুখী ও দূরদর্শী।
মাদক নিয়ন্ত্রণে ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষার অপরিহার্যতা
প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে একটি অকাট্য সত্য তুলে ধরেছেন যে, কেবল আইন প্রয়োগকারী সংস্থা বা প্রশাসনিক কঠোরতা দিয়ে সমাজ থেকে মাদক সম্পূর্ণ নির্মূল করা সম্ভব নয়। মাদকের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সবচেয়ে বড় প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে মানুষের মনস্তত্ত্বে ও পারিবারিক স্তরে, যার মূল উৎস হলো ধর্মীয় রীতিনীতি ও আধ্যাত্মিক মূল্যবোধ। মসজিদ, মন্দির, গির্জা কিংবা প্যাগোডার মতো ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলো যখন যুবসমাজকে নিয়মিত নৈতিকতার পাঠ দেবে এবং ধর্মীয় গুরুরা যখন তাঁদের খুতবা ও বাণীতে মাদকের কুফল সম্পর্কে সচেতন করবেন, তখন তরুণদের মধ্যে এক অভ্যন্তরীণ আত্মশুদ্ধি জাগ্রত হবে। ধর্মীয় অনুশাসন ও আধ্যাত্মিক চর্চা তরুণদের বিপথগামী হওয়া থেকে রক্ষা করার এক মোঘম রক্ষাকবচ। সমাজ সংস্কারের এই মহান ব্রতে সকল ধর্মের আলেম ও পুরোহিতদের সামাজিক দায়বদ্ধতা নিয়ে এগিয়ে আসা আজ সময়ের দাবি।
সিলেটের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও সরকারের সমউন্নয়ন নীতি
মন্ত্রীর বক্তব্যের আরেকটি অত্যন্ত উজ্জ্বল ও তাৎপর্যপূর্ণ দিক ছিল সিলেটের চিরায়ত সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির প্রশংসা এবং রাষ্ট্রের অসাম্প্রদায়িক চরিত্রের প্রতিফলন। সিলেট আবহমানকাল ধরেই ওলি-আউলিয়া ও সুফি-সাধকদের পুণ্যভূমি এবং ধর্মীয় সম্প্রীতির এক অনন্য ও উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। চব্বিশের বিপ্লব আমাদের যে বৈষম্যহীন সাম্যের বাংলাদেশের পথ দেখিয়েছে, সেখানে সংখ্যাগরিষ্ঠ বা সংখ্যালঘু বলে কোনো বিভাজন থাকতে পারে না; প্রতিটি নাগরিকের ধর্মীয় স্বাধীনতা ও মর্যাদা সমান। মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে জানিয়েছেন যে, বর্তমান সরকার এই সম্প্রীতি বজায় রাখতে এবং সিলেটের মুসলিমদের মসজিদ-মাদ্রাসার পাশাপাশি সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মন্দির, শ্মশান কিংবা খ্রিস্টান ও বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের উপাসনালয়গুলোর উন্নয়নে সমান গুরুত্ব দিয়ে কাজ করে যাচ্ছে। সিলেট সিটি করপোরেশনের উদ্যোগে বাস্তবায়িত এই আধুনিক চালিবন্দর মহাশ্মশান কমপ্লেক্সের উদ্বোধন এবং সেখানে জেলা প্রশাসক, অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার ও ভারতের সহকারী হাইকমিশনারের যৌথ উপস্থিতি সরকারের এই অন্তর্ভুক্তিমূলক ও অসাম্প্রদায়িক উন্নয়ন দর্শনেরই এক বাস্তব প্রমাণ।
বন্যা ও মাদক: দ্বিমুখী সংকটে সমন্বিত করণীয়
বর্তমান সময়ে যখন দেশের এক বিস্তীর্ণ অঞ্চল বন্যার পানিতে ভাসছে এবং সরকার দুর্গত মানুষের ত্রাণ ও পুনর্বাসনে ব্যস্ত, তখন এই দুর্যোগকালীন পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে যেন কোনো অসাধু চক্র যুবসমাজকে মাদকের দিকে ঠেলে দিতে না পারে, সেদিকে স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকতে হবে। দেশের প্রতিটি অঞ্চলের ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে কেবল আধ্যাত্মিক উপাসনার কেন্দ্র হিসেবেই নয়, বরং মাদকবিরোধী সচেতনতা তৈরি ও দুর্যোগে আর্তমানবতার সেবায় এক একটি সামাজিক দুর্গ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।
পরিশেষে বলা যায়, ১৭ জুলাই ২০২৬-এর এই উদ্বোধনী অনুষ্ঠানটি কেবল একটি শ্মশান কমপ্লেক্সের সূচনা নয়; বরং এটি নতুন বাংলাদেশের অসাম্প্রদায়িক চেতনা এবং তরুণ সমাজকে সুরক্ষিত রাখার এক রাষ্ট্রীয় অঙ্গীকারের স্মারক। প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরীর এই আহ্বানকে ধারণ করে দেশের সকল ধর্মীয় নেতৃত্ব, স্থানীয় প্রশাসন এবং সাধারণ জনগণ যদি একযোগে কাজ করে, তবে আমরা একটি মাদকমুক্ত, নৈতিক, সমতাভিত্তিক ও সম্প্রীতিময় নতুন বাংলাদেশ উপহার পাব—এটাই আমাদের একমাত্র প্রত্যাশা।