শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড—এই চিরন্তন সত্যটি কেবল কাগজ-কলমে সীমাবদ্ধ না রেখে রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগের প্রধানতম খাতে পরিণত করার এক সাহসী প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ। গত রোববার (১৪ জুন) জাতীয় সংসদে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সম্পূরক বাজেটের আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি দেশের বিগত দুই দশকের শিক্ষা ব্যবস্থাপনার রূঢ় বাস্তবতা তুলে ধরেন।
বাংলাদেশের উচ্চ মাধ্যমিক স্তরকে পার্শ্ববর্তী দেশ সিঙ্গাপুরে ‘ষষ্ঠ শ্রেণির সমমান’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়。 এই তথ্যটি কেবল একটি পরিসংখ্যান নয়, বরং আমাদের বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থার গুণগত মানের এক বড় ধরনের সতর্কবার্তা। তবে এই সংকট কাটিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশনায় শিক্ষা ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানোর যে পরিকল্পনা সরকার হাতে নিয়েছে, তা দেশের নতুন প্রজন্মের জন্য এক উজ্জ্বল ভবিষ্যতের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
বর্তমান সরকার শিক্ষা খাতকে দেশের ‘সবচেয়ে বড় দীর্ঘমেয়াদি’ বিনিয়োগ হিসেবে দেখছে。 ইতিপূর্বে শিক্ষা খাতে বাজেট ছিল জিডিপির মাত্র ১.৩ থেকে ১.৪ শতাংশ, যা বর্তমান সরকার ২ শতাংশে উন্নীত করেছে। প্রতিমন্ত্রীর লক্ষ্য হলো, পর্যায়ক্রমে এই বরাদ্দকে ৫ শতাংশে নিয়ে যাওয়া, যা একটি জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গঠনের জন্য অপরিহার্য। প্রথমবারের মতো জাতীয় বাজেটে শিক্ষা খাতের জন্য সবচেয়ে বড় বরাদ্দ রাখা সরকারের সদিচ্ছারই প্রমাণ দেয়।
প্রাথমিক শিক্ষাকে ‘ফাউন্ডেশনাল নলেজ তৈরির জায়গা’ হিসেবে চিহ্নিত করে প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ বেশ কিছু যুগান্তকারী সংস্কারের কথা জানিয়েছেন।
চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণি থেকেই পারফরমেটিভ আর্টস, ফাইন আর্টস এবং স্পোর্টসকে শিক্ষার অবিচ্ছেদ্য অংশ করা হবে। আটটি খেলাকে পর্যায়ক্রমে বাধ্যতামূলক শিক্ষার আওতায় আনা হবে, যার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ নিশ্চিত হবে। শুধু পাঠ্যক্রম নয়, শিক্ষকদের অবস্থান, অবকাঠামো এবং প্রশাসনিক ব্যবস্থারও বড় ধরনের পুনর্গঠন শুরু হয়েছে।
শিক্ষা কারিকুলামে সংস্কৃতি ও সৃজনশীল উপাদানের অন্তর্ভুক্তি নিয়ে রাজনৈতিক বিরোধীদের নেতিবাচক প্রচারণার কঠোর সমালোচনা করেছেন প্রতিমন্ত্রী। তিনি স্পষ্ট করেছেন যে, কালচারাল এডুকেশন শিক্ষার্থীদের ভুল পথে নয়, বরং উন্মুক্ত ও সৃজনশীল চিন্তার অধিকারী হিসেবে গড়ে তুলবে। শিক্ষা নিয়ে অপরাজনীতি বন্ধ করে দেশের মূল লক্ষ্য অর্জনে গঠনমূলক সমালোচনার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
প্রতিমন্ত্রীর মতে, যদি ২০ বছর আগে শিক্ষা খাতে এভাবে নজর দেওয়া হতো, তবে বাংলাদেশের মানচিত্র ও চেহারা আজ ভিন্ন হতে পারতো। সেই ঐতিহাসিক ভুল সংশোধন করে সরকার এখন এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলতে চায়, যা বিশ্বের কাছে ঈর্ষণীয় হবে।
ববি হাজ্জাজের এই বক্তব্যের মাধ্যমে এটি স্পষ্ট যে, সরকার কেবল সার্টিফিকেটধারী শিক্ষিত গোষ্ঠী নয়, বরং দক্ষ ও বিশ্বমানের নাগরিক তৈরি করতে চায়। সিঙ্গাপুরের মানদণ্ডের সাথে আমাদের বর্তমান ব্যবধান যে বিশাল, তা স্বীকার করে নেওয়াটাই পরিবর্তনের প্রথম ধাপ।
তবে কারিকুলামে আর্টস ও স্পোর্টস যুক্ত করার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের শৈশবকে আনন্দময় এবং জ্ঞানচর্চাকে উন্মুক্ত করার এই প্রচেষ্টা সফল করতে হলে দক্ষ শিক্ষক নিয়োগ ও স্বচ্ছ প্রশাসনিক ব্যবস্থার কোনো বিকল্প নেই।
লেখক: রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান, বিশিষ্ট লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।