ফুটবল বিশ্বকাপের ফাইনাল মানেই শ্রেষ্ঠত্ব আর ইতিহাস গড়ার তুমুল লড়াই। তবে এবারের আর্জেন্টিনা ও স্পেনের মহাদ্বৈরথে যোগ হয়েছে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক আবেগ। স্পেনের ডাগআউটে দাঁড়ানো লুইস দে লা ফুয়েন্তে এবং আর্জেন্টিনার কোচ লিওনেল স্কালোনি একসময় ছিলেন শিক্ষক ও ছাত্র। এবার বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ মঞ্চে একে অপরের মুখোমুখি হচ্ছেন তারা।
প্রথম সেমিফাইনালে ফ্রান্সকে ২-০ গোলে হারিয়ে প্রথম দল হিসেবে ফাইনাল নিশ্চিত করে বর্তমান ইউরো চ্যাম্পিয়ন স্পেন। এর ঠিক পরদিনই ইংল্যান্ডকে ২-১ ব্যবধানে হারিয়ে টানা দ্বিতীয়বারের মতো শিরোপা জয়ের আশা বাঁচিয়ে রাখে বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা। ফলে সোমবারের মেগা ফাইনালে মুখোমুখি হচ্ছে ইউরোপ ও লাতিন আমেরিকার দুই সেরা শক্তি।
২০১০ সালের পর নিজেদের দ্বিতীয় বিশ্বকাপ ট্রফি ঘরে তুলতে মরিয়া স্পেন। অন্যদিকে আর্জেন্টিনার সামনে সুযোগ ১৯৬২ সালে ব্রাজিলের পর প্রথম দল হিসেবে টানা দ্বিতীয়বার বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হওয়ার কীর্তি গড়ার।
তবে এই মহারণের আসল রোমাঞ্চ লুকিয়ে আছে মাঠের বাইরে, দুই কোচের ডাগআউটে। ২০১৭ সালে স্প্যানিশ ফুটবল ফেডারেশনের কোচিং একাডেমিতে কোর্স করেছিলেন সদ্য অবসর নেওয়া লিওনেল স্কালোনি। সেখানে তার অন্যতম প্রশিক্ষক ছিলেন লুইস দে লা ফুয়েন্তে, যিনি তখন স্পেনের বয়সভিত্তিক দলের কোচের দায়িত্বে ছিলেন। খেলোয়াড়ি জীবন শেষে কোচিংয়ের একদম শুরুতে দে লা ফুয়েন্তের কাছ থেকেই দীক্ষা নিয়েছিলেন স্কালোনি। সেই শিক্ষক-ছাত্রের রসায়নই আজ তাদের নিয়ে এসেছে বিশ্বমঞ্চের মুখোমুখি অবস্থানে।
২০২৪ কোপা আমেরিকার সময় সাবেক গুরুর প্রশংসা করে স্কালোনি বলেছিলেন, ‘লুইস আমাদের কোর্সের সময় দারুণ পথপ্রদর্শক ছিলেন। তার সাথে আমার অনেক কথা হয়েছে। আমি সবসময় তার সাফল্য কামনা করি।’ তিনি আরও যোগ করেন, ‘আমি চাই স্পেন ভালো করুক। লুইস যেভাবে দল সামলান এবং ফুটবলাররা যেভাবে তার জন্য মাঠে নিজেদের উজাড় করে দেয়, তা সত্যিই প্রশংসনীয়।’
ছাত্রের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও স্নেহ রয়েছে গুরুরও। স্কালোনির হাত ধরে আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপ, কোপা আমেরিকা ও ফিনালিসিমা জয়ের পর দে লা ফুয়েন্তে তাকে ‘মাস্টার’ সম্বোধন করতেও দ্বিধা করেননি। সেমিফাইনালে ফ্রান্সকে হারানোর পর দে লা ফুয়েন্তে বলেছিলেন, ফাইনালে আর্জেন্টিনার মুখোমুখি হতে পারলে তিনি খুশি হবেন। অনেকেই তখন বিষয়টিকে সহজ প্রতিপক্ষ পাওয়ার আনন্দ ভাবলেও, আসল কারণ ছিল প্রিয় ছাত্রের মুখোমুখি হওয়ার রোমাঞ্চ।
স্কালোনির ব্যক্তিগত জীবনের সাথেও স্পেনের রয়েছে গভীর সংযোগ। তার স্ত্রী স্প্যানিশ এবং দুই সন্তানের জন্মও সেখানে। বর্তমানে পরিবার নিয়ে স্পেনের মায়োর্কাতেই বসবাস করেন এই আর্জেন্টাইন কোচ। খেলোয়াড় হিসেবেও স্পেনের দেপোর্তিভো লা করুনিয়া, রাসিং সান্তান্দেস ও মায়োর্কার হয়ে দীর্ঘ সময় মাঠ কাঁপিয়েছেন তিনি। ২০২৪ ইউরো চলাকালেও স্কালোনি অকপটে স্বীকার করেছিলেন যে, তার হৃদয়ের বড় অংশ জুড়ে রয়েছে স্পেন।
ফাইনালে ওঠার আগে মজার ছলে স্কালোনি বলেছিলেন, ‘লুইসের জন্য আমি সত্যিই আনন্দিত। অসাধারণ একজন মানুষ তিনি। যদি আমাদের সব পরিকল্পনা ঠিকঠাক কাজ না করে, তবে আমি তাকে ফোন করে পরামর্শ নেব। তবে ফাইনালে যদি ওর বিপক্ষেই লড়তে হয়… না, তাহলে ম্যাচের আগে কোনো ফোন নয়!’
সোমবারে সেই প্রতীক্ষিত ফাইনাল। মাঠের বন্ধুত্বের আবহ সরিয়ে রেখে এবার শুরু হবে রণকৌশলের খেলা। ফুটবল বিশ্ব এখন অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে দেখার জন্য—বিশ্বকাপের এই পরম পরীক্ষায় শেষ পর্যন্ত জয় কি গুরুর কৌশলের হবে, নাকি বাজিমাত করবেন তার যোগ্য শিষ্য?