মৌলভীবাজারে ফ্যামিলি কার্ডের ৩য় ধাপের উদ্বোধন করলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান | দৈনিক শব্দমিছিল
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে ফ্যামিলি কার্ডের তৃতীয় ধাপের উদ্বোধন করেছেন। সরকার গঠনের পর এটিই তাঁর প্রথম মৌলভীবাজার সফর।
বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক যখন এক নতুন সমীকরণের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, ঠিক তখনই দিল্লির ইন্দিরা গান্ধী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমানকে ভারতের ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ কর্তৃক প্রবেশে বাধা দেওয়ার ঘটনাটি অত্যন্ত দুঃখজনক এবং গভীর রহস্যের জন্ম দিয়েছে। কূটনৈতিক নিয়ম মেনে সফরের আগে সব ধরনের আনুষ্ঠানিক চিঠি দেওয়ার পরও একজন রাষ্ট্রীয় উচ্চপদস্থ ব্যক্তিত্বকে বিমানবন্দরে যেভাবে ‘আটকে’ দেওয়া হলো, তা আন্তর্জাতিক প্রটোকল এবং ন্যূনতম প্রতিবেশীসুলভ শিষ্টাচারের পরিপন্থী। যদিও পরবর্তীতে দিল্লির উচ্চ মহলের হস্তক্ষেপে তাঁকে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু আত্মমর্যাদাশীল এক নতুন বাংলাদেশের প্রতিনিধি হিসেবে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা সেই ‘অনুমতি’ প্রত্যাখ্যান করে কলম্বো হয়ে ঢাকায় ফেরার যে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তা দেশের সার্বভৌমত্ব ও স্বাধিকারের প্রশ্নে এক বলিষ্ঠ জবাব।
কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে, গতকাল রোববার সন্ধ্যায় এক রাষ্ট্রীয় বা পূর্বনির্ধারিত সফরে দিল্লিতে পৌঁছান প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান। তাঁর এই সফরের ব্যাপারে ভারত সরকারকে আগে থেকেই আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক চিঠি (Diplomatic Note) দিয়ে অবহিত করা হয়েছিল। তা সত্ত্বেও, দিল্লির ইমিগ্রেশন ডেস্কে পৌঁছানোর পর কর্তৃপক্ষ কোনো সুনির্দিষ্ট ও যৌক্তিক কারণ ছাড়াই তাঁকে প্রবেশে বাধা দেয় এবং দীর্ঘ সময় বসিয়ে রাখে।
একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টাকে এভাবে বিমানবন্দরে আটকে রাখার খবর যখন দুই দেশের শীর্ষ মহলে পৌঁছায়, তখন দিল্লির টনক নড়ে। উদ্ভূত পরিস্থিতি সামাল দিতে ভারতের উচ্চ মহলের নির্দেশে তড়িঘড়ি করে তাঁকে দিল্লিতে প্রবেশের ক্লিয়ারেন্স দেওয়া হয়। কিন্তু ততক্ষণে কূটনৈতিক শিষ্টাচারের যে চরম লঙ্ঘন ঘটে গেছে, তার প্রতিবাদে উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান দিল্লিতে না গিয়ে কলম্বো হয়ে ঢাকার উদ্দেশে রওনা দেন।
এই ঘটনার নেপথ্যে কেবল ইমিগ্রেশনের ‘টেকনিক্যাল ভুল’ ছিল, নাকি এর পেছনে দিল্লির কোনো গভীর রাজনৈতিক মনস্তত্ত্ব কাজ করছে—তা নিয়ে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মধ্যে নানামুখী আলোচনা শুরু হয়েছে। সম্প্রতি বাংলাদেশ, নেপাল ও শ্রীলংকায় তরুণ প্রজন্মের ম্যান্ডেট নিয়ে গঠিত নতুন সরকারগুলোর সাথে ভারতের সম্পর্ক এক জটিল সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। নেপালের প্রধানমন্ত্রীর অতি-জাতীয়তাবাদী আচরণ কিংবা বাংলাদেশের সাথে গঙ্গা পানি চুক্তি ও সীমান্ত উত্তেজনার এই আবহে, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টাকে এভাবে হেনস্তা করার চেষ্টা আসলে ঢাকাকে কোনো মনস্তাত্ত্বিক চাপে রাখার কৌশল কি না—সেই প্রশ্ন এড়ানো যায় না।
উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান দিল্লির দেওয়া বিলম্বিত অনুমতি গ্রহণ করে যদি শহরে প্রবেশ করতেন, তবে তা হতো প্রটোকল ভাঙার পর দিল্লির ‘অনুগ্রহ’ গ্রহণ করার শামিল। তিনি সেটি না করে তাৎক্ষণিকভাবে দিল্লি ত্যাগ করে শ্রীলঙ্কা হয়ে দেশে ফেরার যে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তা প্রশংসার দাবিদার। এই সিদ্ধান্ত স্পষ্ট করে দেয় যে, ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশ আর কোনো দেশের ‘বড় ভাই’ সুলভ আধিপত্য বা অন্যায্য আচরণ মুখ বুজে সহ্য করবে না। পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং সমতার ভিত্তিতেই কেবল দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়া সম্ভব।
বাংলাদেশ ও ভারতের ভৌগোলিক বাস্তবতা এমন যে, দুই দেশেরই স্থিতিশীলতার জন্য একে অপরের সহযোগিতা প্রয়োজন। কিন্তু সেই প্রয়োজন যেন কখনো একতরফা তুচ্ছতাচ্ছিল্যে রূপ না নেয়, ভারতকে তা বুঝতে হবে। এই ‘রহস্যজনক’ বাধার বিষয়ে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছ থেকে আনুষ্ঠানিক ও স্পষ্ট ব্যাখ্যা চাওয়া এখন বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব। একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের প্রতিনিধিকে বিমানবন্দরে হেনস্তা করার এই নজিরবিহীন ঘটনা। আমরা আশা করি, অনতিবিলম্বে ভারত সরকার এই কূটনৈতিক ভুলের আনুষ্ঠানিক ক্ষমা কিংবা ব্যাখ্যা দেবে এবং ভবিষ্যতে দুই দেশের ঐতিহাসিক সম্পর্ককে আরও দায়িত্বশীলতার সাথে এগিয়ে নিয়ে যাবে।